«

»

সেপ্টে. ২৬

‘ইসলামী রাজনীতি’র ব্যর্থতা: গলদ কোথায়? (পর্ব ০৪)

……পূর্ব প্রকাশের পর…..

চতুর্দিক থেকে বিদ্রুপ, গালাগালি, অপবাদ, নির্যাতন অর্থাৎ বাধা-প্রতিবন্ধকতা আসতে দেখেও আল্লাহর রসুল বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিনি তাঁর বক্তব্যে অটল থাকলেন। সহজ সরল একটা কথা- ঐক্যবদ্ধ হও ন্যায় ও সত্যের পক্ষে, বল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। তিনি দ্যর্থহীন ভাষায় প্রচার করতে লাগলেন কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা ধর্ম কোনটা অধর্ম, কোনটা হক্ব কোনটা বাতিল। তাঁর কথায় কার স্বার্থে আঘাত লাগল আর কে খুশি হলো তা কখনও ভাবেননি তিনি। কোন কথা জনগণ খাবে, কোন কথা বললে নারাজি হবে- সে হিসাবও কষেন নি কখনও। যা মিথ্যা তাকে মিথ্যা বলতে কুণ্ঠিত হন নি। যা সত্য তাকে সত্য বলতে এতটুকু দ্বিধা করেন নি। দু’টি উদাহরণ দিব।

আল্লাহ তাঁর রসুলকে মিরাজে নিয়ে গেলেন। মিরাজে গিয়ে রসুল বাইতুল মোকাদ্দাস ও সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করলেন, পূর্বের নবী-রসুলগণের সাথে পরিচিত হলেন, জান্নাত-জাহান্নাম দেখলেন, আল্লাহর সাথে কথা বললেন। এ ঘটনা ‘সত্য’। তিনি এ সত্য প্রকাশ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রসুলাল্লাহ যখন এ কথা বাইরে প্রচার করতে সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর চাচাত বোন উম্মে হানি জামা টেনে ধরল। অনুরোধ করতে লাগল- আপনার কথা সত্য তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু এ কথা লোকজনকে বলবেন না। ওরা আপনাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করবে। কিন্তু আল্লাহর রসুল কর্ণপাত করলেন না। ‘আল্লাহর কসম, আমি যা দেখেছি তা বলবই’- এই বলে তিনি বাইরে বেরিয়ে গেলেন। (সিরাত ইবনে ইসহাক)

আল্লাহর রসুল কি জানতেন না মিরাজের কথা প্রকাশ করলে কাফেররা তাঁর বিরোধিতার মস্ত বড় সুযোগ পেয়ে যাবে? জানতেন। শুধু তাই নয়, যারা ঈমান এনেছেন তাদের মধ্যেও অনেকের ঈমান অত পোক্ত হয় নি তখনও, রসুল (সা.) তাও ভালোমতই জানতেন। তবু তিনি গোপন করলেন না, যা দেখেছেন তা স্পষ্টাক্ষরে বলে দিলেন। তাঁর কথা শুনে ঈমানদারদের মধ্যেও অনেকে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গেল, কাফের-মোশরেকরা জনাকীর্ণ পরিবেশে তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করল, হাততালি দিয়ে অপমান করল, হয়ত যারা মনে করছিল মোহাম্মদ (সা.) নবী হলেও হতে পারেন তাদের ঈমানের প্রদীপটি জ্বলতে গিয়েও ধুপ করে নিভে গেল। কিন্তু রসুল (সা.) তাঁর বক্তব্যে অটল। তিনি দাঁড়িয়েছেন সত্য নিয়ে, সত্য থেকে মিথ্যাকে পৃথক করাই তাঁর দায়িত্ব। সেই তিনি কীভাবে সত্যকে চেপে যেতে পারেন? সারা পৃথিবীর মানুষ মিথ্যা বললেও সত্য সত্যই থাকে, সারা পৃথিবীর মানুষ সত্য বললেও মিথ্যা সত্য হয়ে যায় না। আল্লাহর রসুল অন্ধ জনসমর্থন লাভের জন্য আন্দোলন করছেন না, তাঁর আন্দোলন সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, যে কথা আল্লাহ বলেছেন কোর’আনে- তিনিই তাঁর রসুলকে হেদায়াহ ও সত্যদ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে একে অন্য সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন (সুরা ফাতাহ ২৮)। এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন দ্বীনুল হক্ব, সত্যদ্বীন। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- বলুন সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল (বনি ইসরাইল ৮১)।

সুতরাং মিথ্যাকে বিলুপ্ত করার পূর্বশর্ত সত্যের প্রকট হওয়া। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট না হলে সারা আরবের মানুষও যদি রসুলকে অন্ধভাবে সমর্থন করত তবু মিথ্যা থেকেই যেত, আর আজ প্রকৃত ইসলামের ইতিহাস হত অন্য। তাই ইতিহাসে পাই নবুয়্যত লাভের দিনটি থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত এক দিনের জন্যও মিথ্যার সাথে বিন্দুমাত্রও আপস করেন নি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানব।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহর রসুল (স.) যে একজন সত্যনিষ্ঠ মহামানব ছিলেন এবং তিনি তাঁর জীবনে মিথ্যার ভিত্তিতে, গুজবের ভিত্তিতে, মানুষকে ধোঁকা দিয়ে কোনো উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেন নি তার প্রমাণ এই ঘটনাটি। মদীনায় তাঁর ৩ বছরের ছেলে ইব্রাহীম যেদিন ইন্তেকাল করলেন, সেদিন সূর্যগ্রহণ হলো। আরবের নিরক্ষর, অনেকটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকদের মনে এই ধারণা হলো যে, যার ছেলে মারা যাওয়ায় সূর্যগ্রহণ হয়, তিনি তো নিশ্চয়ই আল্লাহর রসুল, না হলে তাঁর ছেলের মৃত্যুতে কেন সূর্যগ্রহণ হবে। কাজেই চলো, আমরা তাঁর হাতে বায়াত নেই, তাঁকে আল্লাহর রসুল হিসাবে মেনে নেই, তাঁর ধর্মমত গ্রহণ করি। তাদের এ মনোভাব মুখে মুখে প্রচার হতে থাকল। আল্লাহর রসুল (সা.) যখন একথা শুনতে পেলেন, তিনি নিজ গৃহ থেকে বের হয়ে লোকজন ডাকলেন এবং বললেন, “আমি শুনতে পেলাম তোমরা অনেকেই বলছ, আমার ছেলে ইব্রাহীমের ইন্তেকালের জন্য নাকি সূর্যগ্রহণ হয়েছে। এ কথা ঠিক নয়। ইব্রাহীমকে আল্লাহ নিয়ে গিয়েছেন আর সূর্যগ্রহণ একটি প্রকৃতিক নিয়ম। এর সাথে ইব্রাহীমের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই।” (হাদীস, মুগীরা ইবনে শো’বা ও আবু মাসুদ (রা:) থেকে বোখারী)।

ঘটনাটি এমন এক সময়ের যখন মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড টানাপড়েন ও বিতর্ক চলছে যে তিনি আসলেই আল্লাহর রসুল কি রসুল নন। এমতাবস্থায় রসুলাল্লাহ কিছু না বলে যদি শুধু চুপ করে থাকতেন, কিছু নাও বলতেন, দেখা যেত অনেক লোক তাঁর উপর ঈমান এনে ইসলামে দাখিল হতো, তাঁর উম্মাহ বৃদ্ধি পেত – অর্থাৎ যে কাজের জন্য আল্লাহ তাঁকে প্রেরণ করেছেন সেই কাজে তিনি অনেকটা পথ অগ্রসর হয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, এসেছিলেন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে, তাই তিনি মিথ্যার সাথে এতটুকুও আপস করলেন না। এতে তাঁর নিজের ক্ষতি হলো। কিন্তু যেহেতু এ কথা সত্য নয় গুজব, সত্যের উপর দৃঢ় অবস্থান থাকার কারণে তিনি সেটিকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দিলেন না। তিনি শক্তভাবে এর প্রতিবাদ করলেন, তিনি জনগণের ঈমানকে সঠিক করে দিলেন। নিজের স্বার্থে তাদের ঈমানকে ভুল খাতে প্রবাহিত করলেন না বা হতে দিলেন না। এটাই ইসলাম। এটাই আল্লাহর রসুলের প্রকৃত আদর্শ। সে আদর্শ থেকে সরে গিয়ে হেকমতের দোহাই দিয়ে বা যে কোনো অজুহাতে মিথ্যার সাথে আপস করে যতই নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক দল, সংগঠন, আন্দোলন পরিচালনা করা হোক, লাখ লাখ কর্মীবাহিনী তৈরি করা হোক, সফলতা আসবে না, আখেরে মিথ্যাই বিজয়ী থাকবে।

উপরোক্ত দুইটি ঘটনা থেকে এ ব্যাপারে সন্দেহের আর অবকাশ থাকে না যে, ইসলামে গুজব ও হুজুগ সৃষ্টি করে স্বার্থোদ্ধার করার কোনো সুযোগ নেই। গুজব সৃষ্টি করে সাময়িক জনসমর্থন তৈরি করা যায়, যা প্রচলিত দাজ্জালীয় সভ্যতার ধান্দাবাজ রাজনীতিকদের জন্য খুব কার্যকরী একটি পদ্ধতি, কিন্তু ইসলাম তা নয়। যারা ইসলাম নিয়ে দাঁড়াবে তাদেরকে সর্বদা সত্যের উপর দণ্ডায়মান থাকতে হবে যদিও তা নিজেদের সাময়িক ক্ষতির কারণ হয়। অথচ বর্তমানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর বিপরীত চিত্রটিই আমাদেরকে দেখতে হয়। মসজিদের মাইক ব্যবহার করে গুজব রটানোর মত গর্হিত কাজও দ্বিধাহীনভাবে করা হয়। আর ভোটের রাজনীতিতে গুজব আর হুজুগের চর্চায় অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে থাকে না ইসলামী বা ইসলামপন্থী দলগুলোও। (চলবে . . .)

……………………………………………………………………………………..

*পরবর্তী পর্বে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব- রসুল (সা.) এর আগমনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

  1.  নাস্তিককে আস্তিক বানানো?
  2.  মূর্তি ধ্বংস করা?
  3.  রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা?
  4.  অপরাধীকে বেত মারা?
  5.  ন্যায় ও সত্যের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা?

(পর্ব ০৫)

 (পর্ব ০৩)

২ মন্তব্য

  1. Ahmed Ullah

    বোররাক রথে চড়ে মহাশুন্য ভ্রমন??

  2. মাহফুজ

    এবার বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন। ধন্যবাদ-

    আবারও কিছু বলছি। আল্লাহতায়ালা তৌফিক দিলে নিশ্চয় এর পরেও বলব। আপনি আপনার মত চালিয়ে যান——

    মসজিদের মাইক ব্যবহার করে গুজব রটানোর মত গর্হিত কাজ করা কোন সৎ ও বিবেকবান মানুষের জন্য শোভা পায়না। আর কোন নামধারী ইসলামী বা ইসলামপন্থী দল যদি এই ধরনের নিষিদ্ধ কাজের সাথে যুক্ত থাকে, তাহলে তার ফায়দা তো নেই, বরং খারাপ পরিনাম তাদেরকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।

    কেউ রাসূলের (সাঃ) জামা টেনে ধরে ‘ইসরা ও মিরাজের’ ঘটনা প্রচার করতে নিষেধ করুক বা নাই করুক, তাতে কোন যায় আসে না। কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে ঐশীবাণী নাযিল করা হয়েছিল- (১৭:১), (১৭:৬০), (৫৩:১৩), (৫৩:১৪), (৫৩:১৫), (৫৩:১৬), (৫৩:১৭), (৫৩:১৮), (৭০:৩)

    সুতরাং এই অলৌকিক ঘটনা কেউ বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, কারো মনে ধরুক বা নাই ধরুক, তা গোপন করার প্রশ্নই আসে না। বরং এটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা রাসূলের (সাঃ) জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ছিল এবং তিনি তা করেছিলেনও। যেহেতু এই ঘটনাকে আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রেরিত কিতাব আল-কোরআনে মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এটি মাইক, রেডিও, টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেটে প্রচার করা হোক বা না হোক, সকল মুসলিম মাত্রই এতে বিশ্বাস করা চাই।

    মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রবাহ কিংবা জন্ম-মৃত্যু ও ভাগ্যের উপর সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের প্রভাব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে কোন বক্তব্যই নেই। বরং এটি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। আর তাই স্পষ্টভাবে এই মিথ্যাচারের বিরোধীতা করে রাসূল (সাঃ) সেটাই প্রমাণ করলেন। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। সুতরাং কোন গুজবে কান না দিয়ে আমরা সকল সময় কেবলমাত্র তাঁরই সাহায্য প্রার্থণা করব।

    //রসুল (সা.) এর আগমনের উদ্দেশ্য কী ছিল?//

    আল্লাহর দ্বীন হিসেবে ‘ইসলামকে’ প্রতিষ্ঠা করা।

     

     

     

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।