«

»

সেপ্টে. ৩০

‘ইসলামী রাজনীতি’র ব্যর্থতা: গলদ কোথায়? (পর্ব ০৫)

(পূর্ব প্রকাশের পর)

শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) এর আগমনের উদ্দেশ্য কী ছিল এ প্রশ্নটির উত্তর যদিও পূর্বে বলে এসেছি এখানে চেষ্টা করব আরেকটু বিস্তারিত আলোচনায় যেতে। বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন বিশ্বনবীর আগমনের উদ্দেশ্য ছিল নাস্তিকদেরকে আস্তিকে পরিণত করা, বিধর্মীদের মূর্তি ধ্বংস করা, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা, জবরদস্তিমূলক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। যারা ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলোকেই বুঝে থাকেন এবং বিশ্বাস করেন যে, মহানবী এগুলোই প্রতিষ্ঠা করতে এসেছিলেন। আসলে মানসিক প্রসারতা না থাকলে আল্লাহর নবীর সেই অভূতপূর্ব মহাবিপ্লবের স্বরূপ বোঝা যাবে না। তাই আল্লাহর নবীর আগমনের উদ্দেশ্য বুঝতে চাইলে মানসিক দ্বৈন্যতা দূর করতে হবে সবার আগে।

মনে রাখতে হবে আল্লাহর রসুল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য আসেন নি, তিনি হচ্ছেন বিশ্বনবী, সারা জাহানের নবী। কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতের মানুষের জন্য পথ-প্রদর্শক হিসেবে তাঁকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এজন্যই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের উপাধি আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ বা সারা জাহানের রহমত (সুরা আম্বিয়া ১০৭)। আল্লাহ বলেননি তাঁর প্রেরিত রসুল কেবল মুসলিমদের জন্য রহমত, যেমনটা আমরা আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মনে করি। আল্লাহ বললেন সমগ্র মানবজাতির কথা অর্থাৎ তিনি আস্তিকের জন্যও রহমত, নাস্তিকের জন্যও রহমত, মুসলমানদের জন্যও রহমত, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের জন্যও রহমত। কোর’আনে আল্লাহ তাঁর রসুলকে শিখিয়ে দিচ্ছেন এ কথা বলতে যে,

হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর প্রেরিত রসুল (আরাফ ১৫৮)।

এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘নাস’ অর্থাৎ মানুষ, সমগ্র মানবজাতি। কাজেই মোহাম্মদ (সা.) কেবল মুসলমানদের নবী নন, সকল জাতি-গোষ্ঠীর জন্য পৃথিবীর বাকি আয়ুষ্কাল পর্যন্ত আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী। আকাশের বৃষ্টি বর্ষিত হবার সময় যেমন আস্তিক-নাস্তিক-ধর্ম-বর্ণ দেখে না, বৃষ্টিধারা থেকে সবাই উপকৃত হয়, তেমনিভাবে বিশ্বনবী আল্লাহর পক্ষ থেকে যে মহাসত্য নিয়ে আবির্ভুত হয়েছিলেন তাও আকাশের বৃষ্টির মতই সার্বজনীন, যা থেকে সবাই উপকৃত হবে। কীভাবে উপকৃত হবে তা ব্যাখ্যা করছি।

আল্লাহ বলেন-

‘তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ কাফের কেউ মু’মিন (তাগাবুন ০২)।’

কাফের হচ্ছে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, মিথ্যা ও অন্যায়ের ধারক, সমাজে অশান্তি সৃষ্টিকারী ফেতনাবাজরা। অন্যদিকে মো’মেন হচ্ছে সত্য ও ন্যায়ের ধারক এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন ও সম্পদ উৎসর্গকারী মানবতার অগ্রদূতরা, যাদের জীবনের উদ্দেশ্য আর কিছু নয় ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবী থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, রক্তপাত, শোষণ, বঞ্চনা দূর করা। সত্য-মিথ্যার ভিত্তিতে এই মো’মেন-কাফের বিভক্তি ছাড়া অন্য কোনো প্রকার বিভক্তি ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহর রসুল তাঁর সারাটি জীবন কাফের তথা মিথ্যা ও অন্যায়ের ধারকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে এমন একটি ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত, দুর্বিনীত মো’মেন জাতি গঠন করেছিলেন যে জাতির উপর দায়িত্ব ছিল সমগ্র দুনিয়া থেকে যাবতীয় অন্যায়কারী, যালেম শক্তির মুলোৎপাটন করে ন্যায়, শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এই যে শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ার জন্য আল্লাহর রসুল তাঁর সারাটা জীবন সংগ্রাম করে গেলেন এবং চলে যাবার সময় তাঁর হাতে গড়া জাতিটিকে সেই দায়িত্ব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন- তার ফল কী হয়েছিল ইতিহাসের পাতায় সেটা আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। রসুলের ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে ওই মো’মেন জাতিটি তাদের নবীর উপর অর্পিত দায়িত্ব পূরণ করতে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ল। মাত্র ৬০/৭০ বছরের মধ্যে অর্ধপৃথিবীর নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষ পেল মুক্তির স্বাদ। মুক্তি পেল সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-ভাষার মানুষ। আল্লাহর রসুলের ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ উপাধির সার্থকতাটা এখানেই। শেষ নবীর মাধ্যমে আসা সত্য প্রতিষ্ঠিত হবার মাধ্যমে যেদিন সমগ্র পৃথিবী থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অশান্তি, রক্তপাত দূরিভূত হবে সেদিন রসুলের এই উপাধি পুরোপুরি সার্থক হবে। এটাই উম্মতে মোহাম্মদীর দায়িত্ব। এই দায়িত্বের কথাই আল্লাহর রসুল তাঁর হাতে গড়া উম্মতে মোহাম্মদী জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে যে, যে বা যারা আমার সুন্নাহ (সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম) ত্যাগ করবে সে বা তারা আমার কেউ নয়, আমি তাদের কেউ নই। (হাদীস)

একটি ঘটনা থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার বোঝা যায়। হিজরতের আগে, যখন মোশরেকদের অমানুষিক অত্যাচার, নির্যাতন মুষ্ঠিমেয় মুসলিমদের অসহ্য হয়ে উঠেছে অথচ তারা অসহায়, কিছু করার নেই, তখন একদিন এক সাহাবা বিশ্বনবীকে (সা.) বললেন- হে আল্লাহর রসুল! আপনি দোয়া করুন যাতে এই মোশরেকরা ধ্বংস হয়ে যায়। এটা ইতিহাস যে মানব জাতির মুকুটমনি (সা.) জীবনে খুব কমই রাগান্বিত হয়েছেন। সেদিন ঐ সাহাবার কথা শুনে তিনি রেগে গিয়েছেলেন এবং বলেছিলেন- শীগগীরই এমন সময় আসছে যখন একটি মেয়ে লোক একা সানা থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবে, তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য পশু ছাড়া আর কিছুরই ভয় করার থাকবে না (হাদীস: খাব্বাব (রা:) থেকে- বোখারী, মেশকাত)।

বিশ্বনবীর কথাটার ভেতরে প্রবেশ করুন। তিনি কি বললেন? তিনি ইংগিত দিলেন, এত বাধা, এত অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি সফল হবেন এবং যাদের ধ্বংস করার জন্য ঐ সাহাবা দোয়া করতে বলছেন তারাই এমন বদলে যাবে এবং তাদের দিয়েই এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে একা একটা মেয়ে মানুষ কয়েক শ’মাইল পথ নির্ভয়ে চলে যেতে পারবে। রসুলাল্লাহ তার সাহাবাকে যে উত্তরটি দিলেন তা দিয়ে শুধু একটি মাত্র কথা বোঝায় আর তা হলো এই যে, তাঁর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে এমন ন্যায়-বিচার, আইন-শৃঙ্খলা ও জনসাধারণের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যে, একা একটি মেয়ে মানুষও ঐ দূরত্বের পথে চলতে কোন ভয় করবে না। তিনি ঐ সাহাবার জবাবে এ কথা বললেন না যে, এমন সময় আসছে যখন এই সব মোশরেক ও কাফেররা দলে দলে মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়বে, রোযা রাখবে, হজ্ব করবে, যাকাত দেবে, দাড়ি রাখবে, টুপি পরবে, চিল্লায় যাবে, খানকায় বসে মোরাকাবা করবে, যিকর করবে। ওগুলো বললেন না কারণ তিনি সংগ্রাম করছেন মানবজীবনে ন্যায়, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, নামাজী-রোজাদার তৈরি করার জন্য নয়। রসুলাল্লাহ (সা.) সেদিন ঐ সাহাবার কথার উত্তরে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা কিছুদিনের মধ্যেই সত্যে পরিণত হয়েছিলো এটা ইতিহাস। এমন একটি সমাজ গড়ে উঠেছিল যেখানে অন্যায় অবিচার লুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো, সম্পত্তি ও জীবনের নিরাপত্তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে সত্যই একজন মেয়ে মানুষ আরবের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত নির্ভয়ে ভ্রমণ করতে পারতো। (চলবে . . .)

(পর্ব ০৬)

(পর্ব ০৪)

৩ মন্তব্য

  1. মাহফুজ

    আপনি বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে মিষ্টি করে কথা বলতে পারেন-

    আপনি বলেছেন- //মনে রাখতে হবে আল্লাহর রসুল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য আসেন নি, তিনি হচ্ছেন বিশ্বনবী, সারা জাহানের নবী। কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতের মানুষের জন্য পথ-প্রদর্শক হিসেবে তাঁকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এজন্যই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের উপাধি আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ বা সারা জাহানের রহমত (সুরা আম্বিয়া ১০৭)। আল্লাহ বলেননি তাঁর প্রেরিত রসুল কেবল মুসলিমদের জন্য রহমত, যেমনটা আমরা আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মনে করি। আল্লাহ বললেন সমগ্র মানবজাতির কথা অর্থাৎ তিনি আস্তিকের জন্যও রহমত, নাস্তিকের জন্যও রহমত, মুসলমানদের জন্যও রহমত, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের জন্যও রহমত। কোর’আনে আল্লাহ তাঁর রসুলকে শিখিয়ে দিচ্ছেন এ কথা বলতে যে,

    [সূরা আরাফ (০৭:১৫৮) অর্থ- বলে দাও, হে মানব মন্ডলী। তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রসূল, সমগ্র আসমান ও যমীনে তাঁরই রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল- এই "উম্মী" নবীর উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহতে এবং তাঁর বাণীসমূহে, তাঁকে অনুসরণ কর যাতে তোমরা সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।]

    এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘নাস’ অর্থাৎ মানুষ, সমগ্র মানবজাতি। কাজেই মোহাম্মদ (সা.) কেবল মুসলমানদের নবী নন, সকল জাতি-গোষ্ঠীর জন্য পৃথিবীর বাকি আয়ুষ্কাল পর্যন্ত আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী। আকাশের বৃষ্টি বর্ষিত হবার সময় যেমন আস্তিক-নাস্তিক-ধর্ম-বর্ণ দেখে না, বৃষ্টিধারা থেকে সবাই উপকৃত হয়, তেমনিভাবে বিশ্বনবী আল্লাহর পক্ষ থেকে যে মহাসত্য নিয়ে আবির্ভুত হয়েছিলেন তাও আকাশের বৃষ্টির মতই সার্বজনীন, যা থেকে সবাই উপকৃত হবে। কীভাবে উপকৃত হবে তা ব্যাখ্যা করছি।//

    আপনার উপরের বক্তব্যে বেশ ভাল ভাল কথা বলেছেন। তবে নিচের বক্তব্য সম্পর্কে কিছু বলতে চাই-

    আপনি বলেছেন- //সত্য-মিথ্যার ভিত্তিতে এই মো’মেন-কাফের বিভক্তি ছাড়া অন্য কোনো প্রকার বিভক্তি ইসলাম সমর্থন করে না।//

    কথাটা সত্য। কিন্তু এরপরও তো কথা থাকে। আরও একটি দল আছে যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়লা আল-মুনাফিকুন নামে গোটা একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন। এই ভণ্ডদের থেকেও তো সাবধান থাকতে হবে। এই শ্রেণীর লোকেরা কিন্তু আল্লাহর কিতাবের এখান থেকে একটু আর ওখান থেকে একটু অংশ নিয়ে জুড়ে দেয় এবং নিজেদের সুবধামত কাটছাট করে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে ভুল দিকনির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করে। এরা মুমিনও না, আবার কাফেরও না। নিজেদের সুবধামত একবার এদিকে, আর একবার ওদিকে হাত মেলায়। আল্লাহতায়ালা এই মুনাফিকদের সম্পর্কে কঠিন আজাবের হুমকি দিয়েছেন। এরা মুসলিমদের শত্রু এবং ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য হুমকি স্বরূপ।

  2. সিফাত

    একটি ই-বুক বানিয়ে ফেলুন।

    1. ২.১
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      হুম। ভালো পরামর্শ। আমারও তেমন ইচ্ছা আছে।

Comments have been disabled.