«

»

অক্টো. ১৩

‘ইসলামী রাজনীতি’র ব্যর্থতা: গলদ কোথায়? (পর্ব ০৭)

. . . পূর্ব প্রকাশের পর . . .

মানবজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার কাজটি কেবল আখেরী নবী নয়, তাঁর পূর্বের নবী-রসুলগণও করে গেছেন। বিশ্বনবীর সাথে অন্যান্যদের পার্থক্য কেবল এই যে, অন্যান্যদের দায়িত্ব ছিল সীমিত পরিসরে, যার যার এলাকায় সীমাবদ্ধ, আর শেষ নবীর দায়িত্ব সমস্ত পৃথিবীময়। কিন্তু কাজ সবারই এক, সেটা হচ্ছে মানবজীবনে ন্যায়, সুবিচার, নিরাপত্তা অর্থাৎ শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর দেওয়া দ্বীনুল হক্ব প্রতিষ্ঠিত হলে সেই প্রত্যাশিত ‘শান্তি’ আসবে বলেই এই দ্বীনের নামকরণ করা হয়েছে ইসলাম অর্থাৎ শান্তি। আল্লাহর রসুল তাঁর নবুয়্যতি জিন্দেগীতে যা কিছু বলেছেন ও করেছেন সবই সমাজের নিরাপত্তার জন্য, মানুষের শান্তির জন্য। আল্লাহ চান বনি-আদম শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করুক।

দ্বীনের ছোটখাটো ব্যাপারে হাজারো ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তওহীদের ব্যাপারে কোনো জাতিকেই আল্লাহ সামান্য পরিমাণ ছাড় দেন নি। ছোট্ট একটি দাবি, ‘‘আমার হুকুম ছাড়া আর কারও হুকুম মানবে না, তাহলেই তোমাদের ব্যক্তিগত জীবনের হাজারো অপরাধ, ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে জান্নাতে দাখিল করব। কিন্তু যদি তওহীদ না মানো, আমাকে হুকুমদাতা হিসেবে মান্য না কর, নিজেরাই নিজেদের ইলাহ বা হুকুমদাতায় পরিণত হও, তবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। এ ক্ষেত্রে কত ওয়াক্ত নামাজ পড়েছো, কতমাস রোজা রেখেছো, কত সম্পদ দান-খয়রাত করেছো, কতবার কোর’আন খতম দিয়েছো, কত বড় পীর হয়েছো ওসব আমি দেখব না।’’ জীবন-বিধানের এই ভিত্তিটাকে অর্থাৎ একেশ্বরবাদ, তওহীদকে স্রষ্টা এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, সেই আদম (আ:) থেকে শুরু করে তার শেষনবী মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেককে পাঠানো হয়েছে ঐ এক দাবী দিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এ যেন এক উন্নাসিক, অহংকারী, একনায়কের তোষামোদির দাবী। কিন্তু তাই কি?

যদি তার এই মহাকাশ, মহাসৃষ্টির দিকে তাকাই তখন দেখি কী অসম্ভব বিরাট এই সৃষ্টি। শুধু যে ছায়া পথের ( Milky Way অর্থাৎ Galaxy) মধ্যে আমাদের এই সৌরজগত, একটাই এত বড় যে এর ঠিক কোনখানটায় আমরা আছি তা সঠিক করে নির্ধারণ আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা করতে পারেন নি। অথচ এই Galaxy ই আরো কত কোটি কোটি আছে যার সংখ্যা বের করা অসম্ভব। আজ পর্যন্ত এই মহাসৃষ্টির সীমা পাওয়া যায় নি। এই অচিন্তনীয় বিশাল সৃষ্টির মধ্যে আমাদের পৃথিবী তো দূরের কথা, এই সৌরজগত যেটার মধ্যে আমরা আছি, এর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা তার কী এত প্রয়োজন পড়লো আমাদের মত কীটানুকীটের কাছ থেকে তার প্রভূত্বের স্বীকৃতি নেবার? আমরা তাকে অস্বীকার করে অন্য যাকে খুশী ইলাহ বলে মেনে নেই, তাতে তার কী আসবে- যাবে? তার দেয়া পথ বর্জন করে নিজেরাই যদি পথ তৈরি করে নেই, তাতেই বা তার কী ক্ষতি বৃদ্ধি হবে?

আসল কথা হলো- তাঁর কিছুই হবে না, তাঁর কিছুই আসে যাবে না। মূল বিষয় হলো তিনি জানেন তার পাঠানো জীবনব্যবস্থা গ্রহণ না করে, নিজেরা তা তৈরি করে তা মেনে চললে তার নিজের হাতের গড়া, তার অতি স্নেহের সৃষ্টি মানুষ অশান্তি আর রক্তপাতে ডুবে থাকবে। তাই তিনি চান মানুষ তার দেয়া জীবনব্যবস্থা মেনে নিয়ে তাদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করুক এবং পরিণামে শান্তিতে পৃথিবীতে বসবাস করুক। যেহেতু তাকে একমাত্র প্রভু, ইলাহ বলে স্বীকার ও বিশ্বাস না করে নিলে তার পাঠানো জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা ওঠেনা তাই ওর উপর, তওহীদের উপর এত কড়াকড়ি। এ কড়াকড়ি আমাদের অশান্তি, অত্যাচার, রক্তারক্তি থেকে বাঁচাবার জন্য ভালবাসার কড়াকড়ি। আল্লাহকে একমাত্র বিধানদাতা বলে স্বীকার ও বিশ্বাস করে নেয়াই আদম (আ.) থেকে মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সমস্ত দ্বীনের, ধর্মের ভিত্তি। এই হচ্ছে দীনুল কাইয়্যেমা, সনাতন ধর্ম, সেরাতুল মোস্তাকীম। এতটুকুই তিনি চান আমাদের কাছে। কেন চান সেটাও ব্যাখ্যা করছি।

অসীম সময় থেকে আল্লাহ তার বিশাল সৃষ্টিকে তার অসংখ্য (হাদীস- আনাস (রা:) থেকে সাবেত আল বুতানী, মুসলিম, মেশকাত) মালায়েকদের দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে প্রশাসন ও পরিচালনা করে আসছিলেন। তারপর এক সময়ে তাঁর ইচ্ছা হলো মানুষ সৃষ্টির। তাঁর এই ইচ্ছা কেন তা আমাদের জানা নেই। কারো জানা আছে কিনা তাও জানা নেই। তাঁর বাণীতে তিনি কিছু আভাষ মাত্র দিয়েছেন। একবার বলেছেন- এ সৃষ্টি আমি সময় কাটাবার জন্য করি নি। (কোর’আন- সূরা আল মুল্ক ২)

অবশ্যই- কারণ সময়ই যার সৃষ্টি তার আবার তা কাটাবার প্রশ্ন কোথায়? আবার বলেছেন- তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চান তোমাদের মধ্যে কারা ভাল কাজ করে (সুরা মুলক ২)। মোট কথা একমাত্র তিনিই জানেন, কেন তিনি এই বিশ্বজগত ও বিশেষ করে একাধারে তার শ্রেষ্ঠ ও সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টি করলেন (বাইয়্যিনাহ ৬-৭)। কিন্তু এ সত্য এড়াবার উপায় নেই যে সৃষ্টি তিনি করেছেন। ঐ সময়টার কথা বলতে যেয়ে তিনি কোর’আনে আমাদের যা বলেছেন তা এইযে, যখন আল্লাহ তার মালায়েক অর্থাৎ ফেরেশতাদের বললেন যে আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেছি তখন তারা বললেন- কী দরকার তোমার প্রতিভু সৃষ্টি করার? ওরাতো পৃথিবীতে ফ্যাসাদ, অশান্তি আর রক্তপাত করবে। (বাকারা ৩০) মালায়েকদের এই উত্তরের মধ্যে নিহিত রয়েছে সৃষ্টি রহস্যের একটা বড় অংশ। কাজেই এখানে একটু থেমে এই অতি প্রয়োজনীয় বিষয়টি ভাল করে বুঝে নেয়া যাক।

ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা (অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ ও রক্তপাত): মানুষ সৃষ্টির বিরুদ্ধে মালায়েকদের যুক্তি

ইসলাম, জুডিয় ও খ্রীস্টান ধর্মমতে আদমের (আ.) এক ছেলে আরেক ছেলেকে হত্যা করেছিলো। ঐ প্রথম রক্তপাত থেকে যে রক্তপাত মানুষ জাতির মধ্যে শুরু হলো তা আজ পর্যন্ত থামে নি। এবং এই অশান্তি ও রক্তপাত আজ পর্যন্ত মানুষজাতির জন্য সর্বপ্রধান সমস্যা হয়ে আছে। ফেরেশতারা যে দু’টি শব্দ মানুষ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন তার একটা ফ্যাসাদ, যার অর্থ অবিচার, অশান্তি, অন্যায় ইত্যাদি। অন্যটি রক্তপাত। দুটো মিলিয়ে অর্থ দাঁড়ায় মানুষ অন্যায়, অশান্তি আর রক্তপাত করবে। সত্যই তাই হয়েছে, আদমের (আ.) ছেলে থেকে আজ পর্যন্ত শুধু ঐ রক্তপাতই নয়, অশান্তি, অন্যায়, অবিচারও বন্ধ হয় নি, এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত মানব জাতির জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা এই অন্যায়, অশান্তি, অবিচার আর রক্তপাত, যুদ্ধ-মানুষ শত চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারে নি। শুধু তাই নয়, এই সমস্যাই মানুষ জাতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যে আজ তার অস্তিত্বই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। (চলবে)

(পর্ব ০৬)

২ মন্তব্য

  1. মাহফুজ

    এই পর্বটা কি আগের পর্বগুলোর সারমর্ম? কথা কি শেষ? নুতন কিছু পাচ্ছিনা কেন?

    1. ১.১
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      এ পর্ব কেবল আগের পর্বগুলোরই সারমর্ম নয়, পুরো লেখাটিরই সারমর্ম বলা যায়। তবে লেখা অনেক দীর্ঘ হবে। আরও অনেক প্রসঙ্গ ঢুকবে। ইতিহাসের সাপেক্ষে বর্তমানের নির্মোহ বিশ্লেষণ করা হবে। মুসলিম জাতির উত্থান ও উত্থানের কারণ যেমন আলোচনায় স্থান পাবে, পতন ও পতনের কারণও স্থান পাবে। সর্বপরি মনে রাখতে হবে- লেখাটি বর্তমানের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। থাকবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনাও।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।