«

»

অক্টো. ১৯

‘ইসলামী রাজনীতি’র ব্যর্থতা: গলদ কোথায়? (পর্ব ০৮)

[লেখাটি এতদিন ‘ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি’ এই শিরোনামে প্রকাশিত হচ্ছিল। এখন থেকে ‘‘ইসলামী রাজনীতি’র ব্যর্থতা: গলদ কোথায়?’’ এই শিরোনামে প্রকাশিত হবে। শিরোনাম পরিবর্তনের ফলে লেখাটির যে নিয়মিত পাঠকরা সাময়িক অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন তাদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।]

(পূর্ব প্র্রকাশের পর)

মানুষ সৃষ্টির বিরুদ্ধে যুক্তি হিসাবে মালায়েকরা এ কথা বলেন নি যে মানুষ মন্দিরে, মসজিদে, গীর্জায়, প্যাগোডায়, সিনাগগে যেয়ে তোমার উপাসনা করবে না, উপবাস করবে না। তারা এসবের একটাও বলেন নি। বলেছেন অশান্তি, অন্যায়, ঝগড়া আর রক্তপাত করবে। অর্থাৎ আসল সমস্যা ওটা নয়, এইটা। আল্লাহ কি বোঝেন নি মালায়েকরা কি বলেছিলেন? তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন এবং তা সত্ত্বেও তাদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে মানুষ বানালেন। তাঁর প্রতিনিধি সৃষ্টির ব্যাপারে স্রষ্টা নিজে আমাদের যে সব তথ্য জানাচ্ছেন তা থেকে আমরা কয়েকটি বুনিয়াদি কথা জানতে পারছি। একটি – তার এই নতুন সৃষ্টিটির গুরুত্ব ও মর্যাদা কত বেশি এবং এর উপর তার স্নেহ কতখানি তা বুঝা যায় এথেকে যে- যেখানে মালায়েকসহ এই বিশাল সৃষ্টি তিনি করলেন শুধু তাঁর মুখের আদেশ দিয়ে- হও! আর সব হয়ে গেলো (কোর’আন- সুরা আল বাকারা ১১৯, সূরা আন নাহল ৪০, সূরা ইয়াসিন ৮২), সেখানে মানুষকে অর্থাৎ আদমকে (আ.) তৈরি করলেন তাঁর নিজ হাতে (কোর’আন সূরা সা’দ ৭৫)। এবং তার দেহের মধ্যে তাঁর নিজের আত্মা থেকে ফুঁকে দিলেন (কোর’আন- সূরা আল হিজর ২৯)। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা, শব্দ ব্যবহার করেছেন আমার আত্মা, স্বয়ং স্রষ্টার আত্মা। অর্থাৎ আল্লাহর যত রকম গুণাবলী, সিফত আছে সব মানুষের মধ্যে চলে এলো। এমনকি তাঁর যে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এটাও ঐ আত্মার সঙ্গে মানুষের মধ্যে চলে এলো। এইটা সম্বন্ধেই আল্লাহ বলেছেন- মানুষকে আমি আমার আমানত দিয়েছি (কোর’আন- সূরা আহযাব ৭২)।

আল্লাহর এই গুণ, এই শক্তিগুলি সৃষ্টির আর কারো নাই- ফেরেশতা, মালায়েকদেরও নেই- সব তার বেধে দেওয়া আইন, নিয়ম মেনে চোলছে। এইগুলিকেই আমরা বলি প্রাকৃতিক নিয়ম। কারো সাধ্য নেই এই নিয়ম থেকে এক চুল পরিমাণও ব্যতিক্রম করে। কারণ তা করার ইচ্ছা শক্তিই তাদের দেয়া হয় নি। ইচ্ছা হলে করব, ইচ্ছা না হলে করব না, এ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি একমাত্র আল্লাহর। মানুষের মধ্যে যখন তিনি তাঁর আত্মা ফুঁকে দিলেন তখন তার মধ্যে স্রষ্টার সমস্ত গুণাবলীর ও শক্তির সঙ্গে ঐ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিও চলে এলো। এটাই হলো তাঁর দেয়া আমানত যা অন্য কোন সৃষ্টি গ্রহণ করতে ভয় পেলো। কিন্তু মানুষ এটা নিয়ে নিজেকে অন্যায়কারী ও জ্ঞানহীন প্রমাণ করলো (কোর’আন- সূরা আল আহযাব ৭২)।

আল্লাহ তাঁর নিজের আত্মা মানুষের মধ্যে ফুঁকে দেয়ার আগে পর্যন্ত মানুষ লক্ষ কোটি সৃষ্টির আরেকটি মাত্র ছিলো। কিন্তু স্রষ্টার আত্মা তাঁর মধ্যে ফুঁকে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে এক অনন্য সৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। সে হয়ে গেলো স্রষ্টার, আল্লাহর প্রতিনিধি যার মধ্যে রয়েছে সেই মহান স্রষ্টার প্রত্যেকটি গুণ, শুধুমাত্র গুণ নয় প্রত্যেকটি শক্তি। শুধু তফাৎ এই যে, অতি সামান্য পরিমাণে। ব্যাখ্যা করতে গেলে বলতে হয়- মহাসমুদ্র থেকে এক ফোটা পানি তুলে এনে তার যদি রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা যায় তবে ঐ এক ফোটা পানির মধ্যে সেই মহাসমুদ্রের পানির প্রত্যেকটি গুণ পাওয়া যাবে, মহাসমুদ্রের মধ্যে যত পদার্থ আছে তার প্রত্যেকটি পাওয়া যাবে। কিন্তু তবু ঐ এক ফোটা পানি মহাসমুদ্র নয়-সে প্রলয়ংকর ঝড় তুলতে পারে না, জাহাজ ডোবাতে পারবে না। সূর্যের আগুন থেকে একটা মোমবাতি জ্বলিয়ে আনলে সেই মোমবাতির শিখায় সূর্যের আগুনের সমস্ত গুণ থাকবে। সেও জ্বালাতে পারবে, আলো দিতে পারবে কিন্তু সে সূর্যের মত গ্রহে গ্রহে আলো আর তাপ ছড়াতে পারবে না। তবুও ঐ মোমবাতির শিখা সেই সূর্য থেকেই আনা আগুন- একই জিনিস। 

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাঁর মালায়েকদের ডেকে হুকুম করলেন তার এই নতুন সৃষ্টি আদম অর্থাৎ মানুষকে সেজদা করতে। ইবলিস ছাড়া আর সমস্ত মালায়েক মানুষকে সেজদা করলেন (কোর’আন- আল বাকারা ৩৪)। এই যে সেজদার কথা বলা হলো, এর অর্থ কি? যারা ভাবেন কেবল মাটিতে মাথা ঠেকানোই ‘সেজদা’ তাদের ধারণা ভুল। বিনীত, বিগলিত হয়ে মাটিতে মাথা ঠেকানোর মাধ্যমে যে সেজদা করা হয় তা প্রকৃত সেজদার প্রশিক্ষণ, প্রতীকী রূপ মাত্র। প্রকৃত অর্থে সেজদা হচ্ছে বশ্যতা স্বীকার করা, আত্মসমর্পণ করা, অনুগত হওয়া। যেমন আজ একদল মানুষ যদি জীবনের সর্বাঙ্গনে আল্লাহর হুকুমকে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহকে জীবনের সার্বভৌম হুকুমদাতা, বিধানদাতা হিসেবে গ্রহণ করে তবে তারা কার্যত আল্লাহকে সেজদাহ করল। অন্যদিকে তারা যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে তাগুতের, শয়তানের, দাজ্জালের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়, তবে তারা দাজ্জালকে সেজদা করল। যদিও তারা ব্যক্তিগত জীবনে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে আল্লাহকে সেজদা করছে তবু তাদের রব আর আল্লাহ থাকলেন না, রব হয়ে গেল দাজ্জাল। দাজ্জাল সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল্লাহর রসুল যে বললেন দাজ্জাল নিজেকে রব দাবি করবে, সেটা ঐ অর্থেই। এ হাদীসের মানে এটা নয় যে, যেভাবে মুসলমানরা নামাজের মধ্যে আল্লাহকে সেজদা করে সেভাবে দাজ্জালকে সেজদা করতে বাধ্য করবে (মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে)। বস্তুত দাজ্জাল মানুষের সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব না মেনে তার নিজের সার্বভৌমত্ব মানতে বলবে। যারা দাজ্জালকে প্রভু, রব বলে গ্রহণ করবে তারা মসজিদে গিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে মাটিতে কপাল ঠেকাবে ঠিকই, কিন্তু কার্যত সেজদা করবে দাজ্জালের পায়ে দাজ্জালের তৈরি করা তন্ত্র-মন্ত্র, ইজমকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ব্যক্তিগত জীবনে তারা আল্লাহর অনুগত হবার ভান করলেও জাতীয় জীবনে অনুগত হবে দাজ্জালের, আল্লাহহীন, ধর্মহীন বস্তুবাদী সভ্যতার।

যাহোক আদমের (আ.) মধ্যে আল্লাহর রূহ ফুঁকে দেওয়ার পর একমাত্র ইবলিশ ব্যতীত আল্লাহর হুকুম মোতাবেক অন্যান্য যে মালায়েকরা তাকে সেজদা করলেন এর মাধ্যমে প্রথমত, ফেরেশতারা মানুষকে তাদের চেয়ে বড়, বেশী উচ্চ বলে মেনে নিলেন, মানুষের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, মানুষের অনুগত হলেন, কারণ তার মধ্যে আল্লাহর আত্মা আছে যা তাদের মধ্যে নেই। দ্বিতীয়তঃ এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে আল্লাহ মানুষের খেদমতে, সেবায় (Service) নিযুক্ত করে দিলেন। আগুন, পানি, বাতাস, বিদ্যুৎ, চুম্বক, মাটি ইত্যাদি লক্ষ কোটি মালায়েক তাই মানুষের সেবায় নিয়োজিত। একমাত্র ইবলিস আল্লাহর হুকুম অমান্য করে আদমকে (আ.) সাজদা করল না, অহংকার করল। 

এখানে একটি প্রশ্ন হতে পারে- মালায়েকরাতো প্রাকৃতিক শক্তি, তাহলে ইবলিস তাদেরই একজন হয়ে, ইচ্ছাশক্তিহীন হয়ে, আল্লাহর আদেশ কেমন করে অমান্য করলো। এর জবাব হচ্ছে- মালায়েকরা সব আলোর তৈরি, একমাত্র ইবলিসই ছিলো আগুনের তৈরি। কারণ মূলতঃ ইবলিস ছিলো একজন জ্বীন- মালায়েক নয়। কঠিন এবাদত ও রেয়াযত করে পরে সে মালায়েকের স্তরে উন্নীত হয়। আগুনের তৈরি বলে তার মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি না থাকলেও অহঙ্কার তখনো বজায় ছিলো, যা সে অত সাধনা করেও নিশ্চিহ্ন করতে পারে নি। মাটির তৈরি আদমকে সাজদা করতে বলায় তার ঐ অহঙ্কার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো বলেই সে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ দিলো যে, তুমি যদি আমাকে এই শক্তি দাও যে আমি মাটির তৈরি তোমার ঐ সৃষ্টিটার দেহের, মনের ভেতর প্রবেশ করতে পারি তবে আমি প্রমাণ করে দেখাবো যে, ঐ সৃষ্টি তোমাকে অস্বীকার করবে। আমি যেমন এতদিন তোমাকে প্রভু স্বীকার করে তোমার আদেশ মত চলেছি, এ তেমন চলবে না। আল্লাহ ইবলিসের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তাকে আদমের দেহ, মন, মস্তিষ্কে প্রবেশ করে আল্লাহকে অস্বীকার করার, তার অবাধ্য হবার প্ররোচনা দেবার শক্তি দিলেন (কোর’আন- সূরা আল বাকারা ৩৬, সূরা আন নিসা ১১৯)। 

এরপরের ঘটনাগুলো অতি সংক্ষেপে এই যে, আল্লাহ তাঁর প্রতিভু আদমের জন্য তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন, তাদের জান্নাতে বাস করতে দিলেন একটি মাত্র নিষেধ আরোপ করে। আল্লাহর অনুমতি পেয়ে ইবলিস আদম ও হাওয়ার মধ্যে প্রবেশ করে তাদের প্ররোচনা দিয়ে ঐ একটিমাত্র নিষেধকেই অমান্য করালো, যার ফলে আল্লাহ তাদের জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নির্বাসন দিলেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (কোর’আন- সূরা আল বাকারা ৩৬) -অর্থাৎ কেয়ামত পর্যন্ত। আর বললেন- নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য পথ-প্রদর্শক (হাদি) পাঠাবো (কোর’আন- সূরা আল বাকারা ৩৮)। 

প্রশ্ন হতে পারে- যে মানুষের মধ্যে তিনি তাঁর নিজের আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন তাকে পথ-প্রদর্শন করতে হবে কেন? এই জন্য হবে যে যদিও মানুষের মধ্যে স্রষ্টার সমস্ত গুণ ও শক্তিই আছে, কিন্তু তা অতি সামান্য পরিমাণে (কোর’আন- সূরা বনি ইসরাইল ৮৫)। মানুষ নিজে তার পথ খুঁজে নিজের জন্য একটি জীবনব্যবস্থা তৈরি করে নিতে পারতো যদি কি কি প্রাকৃতিক নিয়মে এই সৃষ্টি হয়েছে, চলছে তার সবই যদি সে জানতো। কিন্তু তা সে জানেনা। দ্বিতীয়তঃ ইবলিস তো তার মধ্যে বসে নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাকে প্ররোচনা দিয়ে চলেছেই। তার চেয়ে বড় কারণ, ঐ ইবলিসের চ্যালেঞ্জ- মানুষকে দিয়ে আল্লাহকে অস্বীকার করিয়ে, আল্লাহর দেয়া জীবন পথকে বর্জন করিয়ে নিজেদের জন্য জীবনব্যবস্থা তৈরি করিয়ে তাই মেনে চলা- যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি অন্যায়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত। আল্লাহ তাঁর নবীদের মাধ্যমে যুগে যুগে মানুষের জন্য জীবন ব্যবস্থা পাঠিয়ে বলছেন আমাকে একমাত্র প্রভু, একমাত্র বিধানদাতা বলে বিশ্বাস করে, এই জীবনব্যবস্থা মত তোমাদের জাতীয়, পারিবারিক ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা কর, তাহলে তোমাদের ভয় নেই (কোর’আন- সূরা আল বাকারা ৩৮)। কিসের ভয় নেই? ঐ ফ্যাসাদ, অশান্তি, রক্তপাতের এবং পরবর্ত্তীতে জাহান্নামের ভয় নেই। যে জীবনব্যবস্থা, দীন আল্লাহ নবীদের মাধ্যমে বার বার পাঠালেন- এর নাম, স্রষ্টা নিজে রাখলেন শান্তি, আরবি ভাষায় ইসলাম। অর্থ – এই দীন, জীবনব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা করলে তার ফল শান্তি, জাতীয়, পারিবারিক, ব্যক্তিগত জীবনে শান্তি, ইসলাম অর্থাৎ ইবলিশের চ্যালেঞ্জে আল্লাহর জয়। না করলে অশান্তি, অন্যায়, অবিচার মানুষে মানুষে যুদ্ধ, রক্তপাত অর্থাৎ ইবলিশের জয়। তাই সেই আদম (আ.) থেকে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যতবার নবীর মাধ্যমে এই জীবনব্যবস্থা তিনি পাঠালেন, সবগুলির ঐ একই নাম-ইসলাম-শান্তি। স্বভাবতই বিশ্বনবীও তাঁর সারাটি জীবন ব্যয় করেছেন এই ইসলাম তথা ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। যেদিন সমগ্র পৃথিবী থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, যুদ্ধবিগ্রহ দূর হয়ে ন্যায়, সুবিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন ইবলিশের চ্যালেঞ্জে আল্লাহর পূর্ণ বিজয় হবে। সেই বিরাট-বিশাল উদ্দেশ্য নিয়ে আল্লাহর রসুল যে সংগ্রাম (কারও কারও ভাষায় ইসলামী আন্দোলন) আরম্ভ করলেন তারই বিভিন্ন দিক নিয়ে আমাদের এই পর্যালোচনা। আমরা এখন রয়েছি ইসলামের প্রাথমিক অধ্যায় অর্থাৎ নবীজীর মক্কাজীবনের আলোচনায়। (চলবে)

পর্ব ০৯

পর্ব ০৭

১২ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. মাহফুজ

    এবার বেশ ভাল ভাল কথা বলেছেন। চালিয়ে যান—–

    আপনি বলেছেন- //যে জীবনব্যবস্থা, দীন আল্লাহ নবীদের মাধ্যমে বার বার পাঠালেন- এর নাম, স্রষ্টা নিজে রাখলেন শান্তি, আরবি ভাষায় ইসলাম।//

    কিছু কথা যোগ করতে চাই-

        সূরা ইমরান (৩:৮৫) – যে কেউ ইসলাম (একমাত্র আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করা) ছাড়া কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।

     

        ইসলাম শব্দের অর্থ স্বেচ্ছায় মহান স্রষ্টা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা। সুতরাং সর্বাবস্থায় একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিই হলো মুসলিম।

        আল্লাহতায়ালা তাঁর ইবাদত করার বিধান জানানোর জন্যই মানব জাতির কাছে আদম (আঃ) থেকে শুরু করে মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত সকল নবী ও রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহতালার প্রেরিত সকল সংবাদবাহকই ইসলামের একই মূলমন্ত্র প্রচার করেছেন যে, “একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই।”

        ইসলাম ধর্ম হলো সেই সহজ সরল জীবন বিধান যা একজন মানুষকে মহান আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর সৃষ্টিকূলের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য উৎসাহী ও অগ্রসর করে তোলে। সৎকর্ম করার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন ও পরম শান্তি ও মুক্তি লাভ করাই হলো এই ধর্মের মৌলিক শিক্ষা। ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলিম মাত্রই কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ কোরে তাঁরই ইবাদত করতে হবে। স্রষ্টা প্রেরিত ঐশী নির্দেশনা অনুসারে তাঁর ও অন্য সবার আনুগত্য ও অনুসরণ করতে হবে। ঐশী কিতাবে উল্লেখিত সকল বিধান ও সংবাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে ও সৎকর্ম করতে হবে। যারা অন্তরে ও বাস্তবে যতটা লালন ও পালন করার জন্য সচেষ্ট হবেন, পরকালের চুলচেড়া হিসেবে তারা ততটাই সফলকাম বলে বিবেচিত হবেন।

    1. ১.১
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      ধন্যবাদ মাহফুজ ভাই, আপনি বলেছেন- 

      ইসলাম শব্দের অর্থ স্বেচ্ছায় মহান স্রষ্টা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা। সুতরাং সর্বাবস্থায় একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিই হলো মুসলিম।

      ইসলাম শব্দের দুইটি অর্থ করা হয়। একটি অর্থ করা হয় যে, আল্লাহর হুকুমের প্রতি আত্মসমর্পণ করা অর্থাৎ তসলিম করে নেওয়া, দ্বিতীয়ত অর্থ করা হয় ‘শান্তি’। আপাতদৃষ্টিতে এই দুইটি অর্থের মধ্যে তফাৎ পরিলক্ষিত হলেও আলটিমেটলি দু’টির অর্থ কিন্তু একই। কারণ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে যারা জীবন পরিচালনা করবে তাদের জীবনে প্রাকৃতিক নিয়মেই ‘শান্তি’ ও সমৃদ্ধি নেমে আসবে। সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, রক্তপাত দূর হয়ে যাবে।

  2. মোঃ তাজুল ইসলাম

    আসসালামু আলাইকুম।

    যতদুর জানি, ইবলিশ জান্নাতে প্রবেশাধিকার নেই। আর আদম-হাওয়া জান্নাতে বাস করতে ছিলেন। তাহলে ইবলিশ কেমন করে জান্নাতে প্রবেশ করে তাদের দন্ধম ফল খাওয়ালেন? অনুগ্রহ করে জানাবেন।

    1. ২.১
      কিংশুক

      @তাজুল ইসলাম: ময়ুর ও সাপের মাধ্যমে । অবশ্য এ কাহিনী কোরআনে নাই। বিস্তারিত কাহিনী অনেক বড়।

    2. ২.২
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      তাজুল ইসলাম ভাইকে ধন্যবাদ কমেন্ট করার জন্য, বিশেষত সময় করে দীর্ঘ লেখাটি পড়ার জন্য। 

      প্রথমত আমরা সবাই জানি ইবলিশ আদমকে সেজদা না করা অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম পালন না করার অপরাধে বিতাড়িত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইবলিশ কোথা থেকে বিতাড়িত হয়েছিল?

      আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ট। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা। আল্লাহ বললেন তুই এখান থেকে  বের হয়ে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা আরাফ: ১২-১৩)

      আল্লাহ বলেছেন ‘এখান’ থেকে বের হয়ে যা। ‘এখান’ বলতে কিন্তু জান্নাত বোঝানো হচ্ছে না। বলা হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য থেকে বা আল্লাহর হেড কোয়ার্টার থেকে বের হয়ে যেতে। আল্লাহর আরশ ও জান্নাত  এক নয়। ইবলিশ জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছে এমন কথা কোর’আনের কোথাও বলা হয় নাই। যেহেতু কোর’আনের কোথাও বলা হয় নাই সুতরাং আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না। আমরা বলতে পারি না যে, ইবলিশের জান্নাতে প্রবেশাধিকার নেই।

      দ্বিতীয়ত, কোর’আনে ‘ইবলিশ’ ও ‘শয়তান’ দুইটি ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ইবলিশ ও শয়তান এক জিনিস নয়, যেভাবে আদম ও আদম সন্তানরা এক নয়। আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করে নিজের রূহ থেকে আদমকে ফুঁকে দিলেন তখন ‘আদম’ ছিলেন একক ব্যক্তি। তাঁর কোনো সঙ্গী-সাথীও ছিল না, সন্তান সন্তুতিও ছিল না। অন্যদিকে সবাই তাঁকে সেজদা করলেও যে একজন তাঁকে সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানাল সেই ইবলিশও ছিল একক সত্তা। ফলে একক সত্তা হিসেবে আদম যেমন মহাসম্মানীত হলেন, একক সত্তা হিসেবে ইবলিশ তেমন ঘৃণিত ও বিতাড়িত হলো।

      এরপর আল্লাহ আদম থেকে হাওয়া সৃষ্টি করলেন। অর্থাৎ একক আদম আর থাকল না। আদমের বিস্তার শুরু হলো। ব্যক্তি আদম পরিণত হলো জাতি আদমে। 

      হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। (সুরা নিসা ০১)

       

      সুতরাং একক আদমকে আল্লাহ যেভাবে বনি আদমে বিস্তৃত করলেন, স্বাভাবিকভাবেই একক ইবলিশেরও তেমন বিস্তৃত হবার কথা। ইবলিশের সেই বিস্তৃত রূপ অর্থাৎ ইবলিশের সাঙ্গ-পাঙ্গরা হচ্ছে শয়তান। এ কারণে যখনই আল্লাহ আদম থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন তখন থেকেই শয়তানের ব্যাপারে সতর্ক করা শুরু করলেন। তথাপি শয়তানের প্ররোচনার কাছে আদম-হাওয়া ধরাশায়ী হলো।

      অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রনা দিল, বললঃ হে আদম, আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্তকাল জীবিত থাকার বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজত্বের কথা? (সুরা ত্বোয়া-হা: ১২০)

      সুতরাং জান্নাতে প্রবেশ করে আদম-হাওয়াকে প্ররোচনা দেবার কাজটি ইবলিশ নয়, শয়তান করেছিল।

    3. ২.৩
      মহিউদ্দিন

      তাহলে ইবলিশ কেমন করে জান্নাতে প্রবেশ করে তাদের দন্ধম ফল খাওয়ালেন? অনুগ্রহ করে জানাবেন।

      তাজুল ভাই,

      প্রশ্ন হচ্ছে আদম হাওয়া যে জান্নাতে ছিলেন সেটা কি আসলেই  হুবহু সেই জান্নাত যা আল্লাহ কোরআনে তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? কেননা আসল জান্নাতে যারা প্রবেশ করার সৌভাগ্য পাবেন সেখান থেকে তাদেরকে কখনই বিতাড়িত করা হবে না এবং সে নিজেও বাহির হতে চাইবে না। কোরআনে তা স্পষ্ট বলা আছে। যেমন "খালেদিনা ফি হা আ'বাদা"  কিংবা  "লা ইয়াব্ঘুনা আ'ন হা হিওয়ালা"  বাক্যতে দেখতে পাই। অবশ্য বলা যেতে পারে এ সব কেয়ামত বা শেষ বিচারের পরের সম্পৃক্ত কথা।

      যেহেতু কোরআনে এ বিষয়ে পরিষ্কার কোন তথ্য নাই কিংবা সাহাবীরাও এ ব্যাপারে রাসুলকে (স:) প্রশ্ন করেছেন বলে কোন হাদিস নাই। তবে এ বিষয়ে অতীতে আমাদের উলেমারা ও তাফসির-কারিরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এ সবই তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা মাত্র এবং সেটাও অনেকের কাছে প্রশ্ন সাপেক্ষ হতে পারে। 
      ইবলিসকে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার ও অহংকারের জন্য যে স্থান থেকে বেরিয়ে যেতে বলে ধিক্কার দেয়া হয়েছিল সে স্থান ভিন্ন হতে পারে  আর আদম হাওয়া যেখানে ছিলেন সে স্থানও হয়তবা জান্নাত সাদৃশ্য কোন উদ্যান ছিল যাকে  জান্নাত বলা হয়েছে (সুরা বাকারা, আয়াত ৩৫) । আর যদি সেটা আসল জান্নাত হয়েও থাকে (যা আমাদের উলেমারা মনে করেন) তবে সেখানে ইবলিস বা শয়তানের access ছিল বা তার পক্ষে কোন উপায়ে পৌছানো সম্ভব ছিল। শয়তান যে ভিন্ন রূপ ধারণ করে মানুষকে ওসওয়াসা দিতে সক্ষম সে বিষয় আমরা জানি হাদিস সূত্রে সে আরেক আলোচনা। তবে শয়তান তো আদমকে বিপথগামী করার সময় চেয়ে আল্লাহর কাছে অনুমতি চেয়েছিল। আর আল্লাহ সে সুযোগ দেয়ার কারণে অর্থাৎ সে অনুমতি সাপেক্ষে তার পক্ষে আদম ও হাওয়ার কাছে যে কোন উপায়ে পৌছার ক্ষমতা ছিল যার ফলে তাঁদেরকে সে নিষিদ্ধ ফল খাওয়াতে ধোঁকা দিতে পেরেছিল। আল্লাহ ভাল জানেন।  তবে শয়তান যেখানেই থাকুক না কেন সে মর্যাদাহীন ও ধিক্কৃত এবং লাঞ্ছিত দেউলিয়া এক সত্তা, সে মানুষের শত্রু । সে জন্য বিতাড়িত শয়তান থেকে মুমিনকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে।  

      বটম লাইন হচ্ছে, আপনার প্রশ্নের উত্তর জানা বা না জানা এটা এমন কোন বড় ব্যাপার নয় (not a big deal) যে ইসলামের কোন উসুল বা আদর্শ পালনে অন্তরায় সৃষ্টি হবে। আমি কয়েকজন আলেম ও ইসলামী বিষয়ে বিজ্ঞ জনের সঙ্গে আলাপ করে দেখেছি সবাই এ মত পোষণ করেন। অতএব এ নিয়ে অযথা চিন্তা না করাই ভাল।

       

    4. ২.৪
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      মহি ভাই, আসাদ ভাই, কিংশুক ভাই, আপনাদের ধন্যবাদ উত্তর দেওয়ার জন্য।

      না, এই প্রশ্নের উত্তরের সাথে ইসলামের আদর্শের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। এমনি জানতে চেয়েছিলাম।

  3. মাহফুজ

    @মোহাম্মদ আসাদ আলী:
    ধন্যবাদ- আসাদ ভাই,
    আপনার সাথে পুরোপুরি দ্বিমত না করেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আবার কিছু বলতে চাই-
    ইসলাম অর্থাৎ মহান স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোন দ্বীনই অর্থাৎ কোন জীবন বিধানই যে মানুষকে পরম শান্তি দিতে পারবে না তাতে কোন দ্বিমত ও সন্দেহ নেই।
    আপনি বলেছেন- //আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে যারা জীবন পরিচালনা করবে তাদের জীবনে প্রাকৃতিক নিয়মেই ‘শান্তি’ ও সমৃদ্ধি নেমে আসবে। সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, রক্তপাত দূর হয়ে যাবে।//
    কিন্তু এ পৃথিবীতে তো এমনও অনেক অঞ্চল আছে যেখানে স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার পরও অনেক ইমানদার মানুষই প্রাকৃতিক নিয়মে শান্তি ও সমৃদ্ধির ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। অনেক সমাজ আছে যেখানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইমানদার মানব সন্তানেরা অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, রক্তপাত ইত্যাদি থেকে মুক্তি পাচ্ছেনা। তাহলে তাদের কাছে ‘ইসলাম’ অর্থ ‘শান্তি’- এর প্রকৃত রূপ কি? কেউ ইসলাম গ্রহণ করলেই কি তাকে অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, রক্তপাত মুক্ত সমাজের গ্যারান্টি দেয়া যায়?
    প্রভু মহান স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে ইমানদার বান্দা হিসেবে একজন মানুষ আত্মিক প্রশান্তি লাভ করতেই পারেন। ইহকালে অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, রক্তপাত, রোগ-শোক, প্রতিবন্ধিত্ব, দারিদ্র্য, যুদ্ধবিগ্রহ, টাকার জোরে প্রকৃত দোষী ব্যক্তির দোষ কোন নিরাপরাধ ইমানদার মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ায় কিংবা ইসলামের পক্ষে কথা বলায় ও কাজ করার কারণে কারাগারের অন্ধকার কুঠরিতে বছরের পর বছর নমরূদের প্রেতাত্মাদের হাতে নিদারূন নির্যাতন ভোগ করতে করতে মৃত্যুবরণ- ইত্যাদি নানা কারণে পার্থিব শান্তির খোঁজ না পেলেও, সত্যিকার ইসলাম গ্রহণকারী অর্থাৎ স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তির জন্য পরম শান্তির ঠিকানা হলো পরকাল।
    ধন্যবাদ-

    1. ৩.১
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      @মাহফুজ:

      প্রথমত আপনাকে ব্যক্তি ও সমষ্টির পার্থক্য বুঝতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আপনি আল্লাহর উপর ঈমান আনলেন, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আত্মসমর্পণ করলেন অথচ জাতির সমষ্টিগত জীবন পরিচালিত হচ্ছে আল্লাহর দ্বীনের পরিপন্থী সিস্টেমে- এমনটা হলে অবশ্যই আপনি ব্যক্তিগতভাবে অন্যায়, অবিচার, দুর্দশা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন না। নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও ভস্মিভূত হয়। সুতরাং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পিত হতে হবে সমষ্টিগতভাবে, জাতিগতভাবে, তবেই আসবে শান্তি (ইসলাম)।

      দ্বিতীয়ত, আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করার অর্থ কী? আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের অর্থ আল্লাহর দেওয়া সিস্টেমকে, দ্বীনকে জীবনের সর্বাঙ্গনে প্রয়োগ করা। কোনো জাতির লোকজন দিবারাত্রি আল্লাহকে সেজদা করল, নামাজ-রোজা করে আসমান-জমিন ভরিয়ে ফেলল কিন্তু তাদের রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক সিস্টেম ও আইন-কানুন, দণ্ডবিধিতে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আত্মসমর্পণের চিহ্নমাত্র নেই, তাহলে সেটাকে আত্মসমর্পণ বলা যাবে কি? আপনি জীবনের ব্যক্তিগত ভাগে আল্লাহর দ্বীনের প্রয়োগ ঘটাবেন, কিন্তু সমষ্টিগত ভাগ পরিচালিত করবেন নিজেদের খেয়াল-খুশিমত, অর্থাৎ আংশিক মানবেন আংশিক প্রত্যাখ্যান করবেন, আবার কামনা করবেন যেন শান্তি (ইসলাম) আসে, সেটা কী করে সম্ভব?

      আজকের মুসলিম বিশ্বে যদি সত্যিকার অর্থেই আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম কার্যকরী থাকত তবে এদের জীবনে এত অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, শোষণ, বঞ্চনা, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ-বিগ্রহ, নিরাপত্তাহীনতা থাকত না। শান্তি নেমে আসত। ইসলাম নেই বলেই শান্তি নেই। পরকালে যাদের জন্য অতুলনীয় সুখ-শান্তি অপেক্ষা করছে তারা ইহকালে অশান্তির আগুনে জ্বলবে- এটা বিধির বিধান হতে পারে না। পরকালের মত তাদের ইহকালও শান্তিময় হবে। এ কারণেই আল্লাহ দোয়া করতে শিখিয়েছেন- 

      হে প্রভু, আমাদের দুনিয়া সুন্দর করে দাও এবং পরকালও সুন্দর করে দাও, আর আমাদেরকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। (বাকারাহ: ২০১)

      1. ৩.১.১
        মাহফুজ

        @ আসাদ,

        সমষ্টিগত ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপনার ও আমার চিন্তা-চেতনার মাঝে তেমন দ্বিমত নেই বলেই মনে হয়।

        তবে আপনার এই বক্তব্যের বিষয়ে কিছু বলতে চাই- //কোনো জাতির লোকজন দিবারাত্রি আল্লাহকে সেজদা করল, নামাজ-রোজা করে আসমান-জমিন ভরিয়ে ফেলল কিন্তু তাদের রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক সিস্টেম ও আইন-কানুন, দণ্ডবিধিতে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আত্মসমর্পণের চিহ্নমাত্র নেই, তাহলে সেটাকে আত্মসমর্পণ বলা যাবে কি? আপনি জীবনের ব্যক্তিগত ভাগে আল্লাহর দ্বীনের প্রয়োগ ঘটাবেন, কিন্তু সমষ্টিগত ভাগ পরিচালিত করবেন নিজেদের খেয়াল-খুশিমত, অর্থাৎ আংশিক মানবেন আংশিক প্রত্যাখ্যান করবেন, আবার কামনা করবেন যেন শান্তি (ইসলাম) আসে, সেটা কী করে সম্ভব?//

        ব্যক্তিদের নিয়েই সমাজ গঠিত হয়। সুতরাং ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম গ্রহণ অর্থাৎ মহান স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করেই সমষ্টিগতভাবে তা প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হতে হবে। খাঁটি ইমানে দিবারাত্রি আল্লাহকে সেজদা করে, নামাজ-রোজা করে দ্বীন-ইসলাম পালন করা যাবেই না, এরূপ একপেশে মনোভাবের সাথে আমি একমত হতে পারলাম না। একজন সত্যিকার মুসলিম সালাত কায়েমে ও সাওম পালনে যেমন নিবেদিত হবেন। তেমনি  রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক সিস্টেম, আইন-কানুন ও দণ্ডবিধিতে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়িত হোক, সেটাও মনেপ্রাণে চাইবেন। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সাধ্যমত চেষ্টা-সাধনাও করে যাবেন। এটাই তো ইসলাম।

        প্রতিটি মুসলিমই ব্যক্তিগত তথা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চায়। কিন্তু ইসলামের বিধান রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে খেয়াল-খুশিমত, অর্থাৎ আংশিক মানা ও আংশিক প্রত্যাখ্যান করার সাথে যারা জড়িত, সেই জবাবদিহি তাদেরকে দিতে হবে বৈকি। রাষ্ট্রীয়-ইসলাম প্রতিষ্ঠা না করে ভিন দেশি সিস্টেমে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সেই রাষ্ট্রে বসবাসরত কৃষক, তাতী, জেলে, কামার, রিক্সা কিংবা ট্যাক্সি চালক সহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে নিশ্চয় চুলচেড়া হিসেবের মালিক মহান আল্লাহ সমানভাবে দোষি সাব্যস্ত করবেন না।

        প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয়-ইসলাম অনেক আগেই গত হয়েছে। বর্তমানে এ ভূখণ্ডের কোথাও রাষ্ট্রীয়-ইসলাম আছে কি? কিন্তু তাই বলে অ-ইসলামিক রাষ্ট্রে বা প্রতীকি ইসলামি রাষ্ট্রে ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম গ্রহণ করার কোন মূল্যই থাকবেনা- তা কি করে হয়? অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, শোষণ, বঞ্চনা, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত ও নিরাপত্তাহীনতা কোন যুগে ছিলনা, বলতে পারবেন কি? সব যুগেই কম-বেশি ছিল এবং থাকবে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেলে অন্যায় কর্ম-কাণ্ড যে অনেক কমে যাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু যতদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেনা, ততদিন তো ইহকালীন সকল অন্যায়-জুলুম সহ্য করেই পরকালীন পরম শান্তির আশায় অন্তত ব্যক্তিগত পর্যায়ে তো সাধ্যমত ইসলামকে লালন ও পালন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে। ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি না হলে আমাদের দোয়া (০২:২০১) কবুল হবে কিভাবে আর সামষ্টিক অর্থাৎ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আন্দোলনই বা গড়ে উঠবে কিভাবে? তাই আসুন, ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি।

        ধন্যবাদ-

  4. মহিউদ্দিন

    @ আসাদ

    প্রকৃত ইসলাম কার্যকরী থাকত তবে এদের জীবনে এত অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, শোষণ, বঞ্চনা, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ-বিগ্রহ, নিরাপত্তাহীনতা থাকত না। শান্তি নেমে আসত। ইসলাম নেই বলেই শান্তি নেই। 

    এ সব কথা যতই বলা হউক না কেন কোন লাভ নাই। এ সব যে আসলেই বর্তমান কোন সমাজে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব সে বিশ্বাস কীভাবে জাগানো যায় সাধারণ মানুষের মনে তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। কোন সমাজ ব্যবস্থায় বাস্তবে তা কার্যকর করতে হলে উপরোক্ত আদর্শে বিশ্বাসী যারা তাদেরকে সমাজের ও  রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যেতে হবে। কিন্তু তাগুতি শক্তি তা হতে দিবে না তখন কি করতে হবে? তা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে জরুরী।

    1. ৪.১
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      @মহিউদ্দিন,

      পরবর্তী পর্বগুলোতে এ প্রসঙ্গ আসবে ইনশা’আল্লাহ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।