«

»

Apr ০২

জঙ্গিরা যে কারণে পথভ্রষ্ট

এটা তো সত্য যে, পবিত্র কোর’আনে জিহাদ-কিতাল সম্পর্কিত শত শত আয়াত আছে। সেখানে জিহাদের স্পষ্ট হুকুম আছে। কীভাবে শত্রুদেরকে কতল করতে হবে তার নির্দেশনা আছে। এমনকি এ পর্যন্ত আছে যে, অস্ত্র হালকা হোক আর ভারি হোক, বেরিয়ে পড়তে হবে। আবার হাদীসের বইতে জিহাদের উপর আলাদা অধ্যায় আছে। সিরাতের অর্ধেক জুড়ে রয়েছে বিশ্বনবীর যোদ্ধা জীবনের খুঁটিনাটি বর্ণনা। সেসব পড়লে আখেরী নবীকে একজন যোদ্ধা এবং তিনি যে জাতিটি তৈরি করেছিলেন সেটাকে পুরোদস্তুর একটি যোদ্ধা জাতি বলেই প্রতিভাত হয়।

এমতাবস্থায়, জঙ্গিরা কোর’আনে বর্ণিত জেহাদের সেই আয়াতগুলো, হাদীসে বর্ণিত জেহাদ বিষয়ক রসুলের বাণীগুলো আর সিরাতে বর্ণিত যুদ্ধাভিযানের ঘটনাগুলোকেই ব্যবহার করছে নিজেদের জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডকে যাস্টিফাই করার জন্য। এখানে প্রশ্ন উঠছে- কোর’আনে যদি আল্লাহ যুদ্ধের হুকুম করেই থাকেন, কাফেরদেরকে হত্যার অনুমতি দিয়েই থাকেন, তাহলে একজন ধর্মবিশ্বাসী ঈমানদার ব্যক্তি তো সেই হুকুম পালন করতে চাইবেই, তাই নয় কি? তাহলে কোন যুক্তিতে আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের কর্মকাণ্ডকে অন্যায় সাব্যস্ত করছি আর তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলছি?

গত কয়েক দিনে অনেকবার এই প্রশ্নটি চোখে পড়েছে। সাধারণত ইসলামের কোনোকিছুই যাদের ভালো লাগে না সেই ইসলামবিদ্বেষীরা প্রশ্নটির অবতারণা করছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ধর্মবিশ্বাসী মুসলিমদের মধ্য থেকে এসব প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব দেয়া তো দূরের কথা, আমার ধারণা আমাদের শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ নিজেরাই এই বিষয়টি নিয়ে আসলে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। কোর’আন-হাদীসের জিহাদ সম্পর্কিত অংশগুলো নিয়ে যেন তারা নিজেরাই বিব্রত বোধ করছেন। কারণ, জঙ্গিরা এসব আয়াতের অপব্যাখ্যা করছে এই কথা বলাটা যতটা সহজ, ‘তাহলে এইসব আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা কী হবে’- এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া তাদের কাছে ততটাই কঠিন।

যাহোক, আমরা হেযবুত তওহীদ বরাবরই এই প্রশ্নের জবাব দিয়ে আসছি যে, কোর’আন-হাদীসে জিহাদ-কিতালের স্পষ্ট নির্দেশ থাকার পরও জঙ্গিরা কেন পথভ্রষ্ট। 

ইসলামী পরিভাষায় ‘আকীদা’ বলে একটি শব্দ প্রচলিত আছে, যার ব্যাপারে অতীতের সকল আলেমগণ একমত হয়ে বলেছেন, আকীদা সঠিক না থাকলে ঈমানের কোনো মূল্য নেই। আমরা জঙ্গিবাদকে ভুল পথ এবং জঙ্গিদেরকে পথভ্রষ্ট বলছি মূলত এই আকীদার ভিত্তিতে। স্পষ্টত জঙ্গিরা হচ্ছে আকীদাচ্যুত।

ইসলামের আকীদা বলতে বোঝায়- ইসলাম আল্লাহ কী লক্ষ্যে পাঠিয়েছেন, রসুল কেন পাঠিয়েছেন, কোর’আন কেন পাঠিয়েছেন, মো’মেন কে, কাফের কে, জিহাদ কী ও কেন, কেতাল কী ও কেন, কোন প্রেক্ষাপটে জিহাদ ফরদ, কার বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হয়, কার হুকুমে জিহাদ করতে হয়, জিহাদ ও কিতালের মধ্যে পার্থক্য কী, জিহাদ ঘোষণা করার অধিকার কার আছে ইত্যাদি এক কথায় সামগ্রিকভাবে ইসলাম সম্পর্কে মোটা দাগে স্পষ্ট ধারণা থাকা।এই সম্যক ধারণাকে দৃষ্টিশক্তির সাথে তুলনা করা চলে, যে দৃষ্টিশক্তি থাকলে কেউ হাতির লেজ ধরিয়ে বিশ্বাস করাতে পারে না যে, হাতি রশির মত। অন্যদিকে দৃষ্টিশক্তি যার নাই, তাকে খুব সহজেই কোনো বস্তু সম্পর্কে ভুল ধারণা দিয়ে ভুল কাজ করানো সম্ভব। আজকে এই সম্যক ধারণা বা আকীদা নেই বলেই ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে এখান থেকে কোর’আনের একটি আয়াত, ওখান থেকে হাদীসের একটি বাণী, সেখান থেকে সিরাতের একটি ঘটনা টেনে এনে তাকে দিয়ে যা তা করানো সম্ভব হচ্ছে।

আমরা জানি ইসলামের বহু বিধান রয়েছে। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, জিহাদ, কিতাল ইত্যাদি। এই বিধানগুলোকে একেকটি ফুল মনে করুন। আর ইসলামকে মনে করুন সেই ফুলগুলো দিয়ে তৈরি মালা। ফুলগুলোকে যতক্ষণ না একটি সুতো দিয়ে একত্রে গেঁথে সেই সুতোটি গিঁট দেওয়া হবে ততক্ষণ কি সেটা মালা হতে পারবে? পারবে না। এই সুতোর গিঁটটাই হচ্ছে আকীদা। আমরা বিয়ের ব্যাপারে ‘আকদ’ শব্দটি ব্যবহার করি একজন পুরুষের সাথে একজন নারীর ‘সংযোগ করে দেওয়া’ বোঝাতে।

অর্থাৎ যে জ্ঞান বা ধারণার মাধ্যমে ইসলামের সমস্ত বিধান, সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত রীতি-নীতি ইত্যাদি একটি সূত্রে সমন্বিত থাকে সেটাই আকীদা। আজকে আমাদের সমাজে মসজিদ ভর্তি মানুষ নামাজ পড়ছে, লক্ষ লক্ষ লোক হজ্ব করতে যাচ্ছে, রমজান মাসে রোযা রাখছে, ঈদের দিনে উৎসব করছে, আবার কথিত জিহাদও করছে, কিন্তু এই বিধানগুলোর একটির সাথে আরেকটির কী সম্পর্ক তা কেউ জানে না। কোন আমলের পূর্বশর্ত কোনটা তাও তাদের অজানা। তারা নামাজ পড়ছে কিন্তু নামাজের উদ্দেশ্য অজানা। লাখ লাখ টাকা খরচা করে হজ্ব করতে যাচ্ছে কিন্তু জানে না হজ্বের উদ্দেশ্য কী। জিহাদের নামে শরীরে বোমা বেধে আত্মঘাতী হয়ে যাচ্ছে কিন্তু জানে না জিহাদের উদ্দেশ্য কী। তারা জানে না নামাজের সাথে জিহাদের সম্পর্ক কী, আবার জিহাদের সাথে তওহীদের সম্পর্ক কী। অর্থাৎ ফুল অনেক থাকলেও সেগুলো কেবলই ছিন্নবিচ্ছিন্ন ফুল। সেই ফুল কখনও মালা হয়ে উঠে নি। আর যতক্ষণ এই ফুলগুলো একত্রে গ্রন্থিত হয়ে মালা তৈরি না হয় ততক্ষণ সেটা বিশ্বনবীর ইসলাম হয় না। সেটা হয়ে যায় গোঁজামিলের ইসলাম। আর গোজামিলের ইসলাম আজ জঙ্গিবাদের জন্ম দিচ্ছে, কাল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দিবে, পরশু অপরাজনীতির হাতিয়ার হবে- এটাই তো স্বাভাবিক। আকীদা না থাকলে মানুষের ঈমান কীভাবে ভুলখাতে প্রবাহিত হতে পারে তার একটি উপমা দেই।

একাত্তরে আমাদের মুক্তিবাহিনী পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সেই যুদ্ধে তারা পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজনে বোমা মেরে আমাদের দেশেরই ব্রিজ-কালভার্ট উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেজন্য কি তাদের প্রতি আমাদের কোনো অভিযোগ আছে? নেই। কারণ আমরা জানি মুক্তিযোদ্ধারা কেন ওসব করেছিলেন। 

তারা সেদিন যা যা করেছেন সব আমাদেরই মুক্তির জন্য, আমাদেরই কল্যাণের জন্য। তাতে সমগ্র দেশবাসীর সমর্থন ছিল। তারা ছিলেন স্বাধীন বাংলার যুদ্ধরত সেনাবাহিনী। অর্থাৎ ঐ সময়ের প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাঙালি জাতির প্রতি হওয়া অন্যায় ও তার ফলে স্বাধীনতা ঘোষণা, পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ও বাঙালির প্রতিরোধ- এইসমস্ত ঘটনার একটির সাথে অপরটির সম্পর্ক অর্থাৎ সামগ্রিক ধারণা আমাদের জানা আছে বলেই আমরা গর্বভরে বলতে পারছি- একাত্তরে আমাদের মুক্তিবাহিনী অন্যায় করে নাই, যদিও তারা অনেক স্থাপনা বিধ্বস্ত করেছেন, অনেক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছেন, এমনকি মানুষ হত্যা পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু আজকে যদি এই স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো নাগরিক হঠাৎ একটি বোম মেরে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে বলে- ‘‘আমি মুক্তিযোদ্ধা! আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করছি’’ তাকে কী বলবেন? সেও হয়ত কিছু অন্যায়, অবিচারের কথা শুনিয়ে বলবে- পাকিস্তানিরা যেভাবে আমাদের সাথে অন্যায় করত, অমুক সরকার সেভাবেই জনগণের সাথে অন্যায় করছে, আমাদেরকে শোষণ করছে, পাকিস্তানিদের মতই এদেশের সম্পদ পাচার করে বিদেশে জমা করছে ইত্যাদি। কিন্তু এজন্য কি তার বোমা মারা যায়েজ হয়ে যায়? সেও রেফারেন্স হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস বইয়ের ভেতর থেকে কোনো একজন মুক্তিযোদ্ধার কোনো একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা টেনে বলবে- এই যে, দ্যাখো অমুক মুক্তিযোদ্ধা এত তারিখে এই স্থানে এইভাবেই বোমা মেরে অমুক ব্রিজটি উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সুতরাং তিনি যদি অন্যায় না করেন তাহলে আমিও অন্যায় করি নাই। আপনি কি তার যুক্তি মেনে নিবেন? মানবেন না। কারণ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আপনার সামগ্রিক ধারণা আছে। আপনার আকীদা পরিষ্কার।

ইসলামের প্রকৃত আকীদা অর্থাৎ ইসলাম সম্পর্কে সম্যক ধারণা যদি মানুষ পেত তাহলে জঙ্গিবাদ কেন ভ্রান্তপথ তা বুঝতে দুই মিনিটও লাগত না। অন্যদিকে এই আকীদা যাদের অজানা তারা যতই হম্বিতম্বি করুন, কোর’আনের মহাপণ্ডিত হলেও জঙ্গিবাদীদের যুক্তি-প্রমাণের কাছে তাদেরকে ধরাশায়ী হতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণকে ইসলামের এই প্রকৃত আকীদা শিক্ষা দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply