«

»

নভে. ১৩

বিজ্ঞান হবার যোগ্যতা

বাংলাদেশে এবং বাংলা অনলাইন জগতে যা ইচ্ছা বিজ্ঞানের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানের ক্রাইটেরিয়া কী কী সেটা না জানার কারণে ঐসব প্রচলিত তথ্যকে বিজ্ঞান বলে বিশ্বাস করেন। এবং একই কারণে আমার আগের পোস্ট "বিশ্বাসের ভাইরাস ও আধুনিক বিজ্ঞান" সবাই বুঝে উঠতে পারেনি। তাই, কোন কিছুকে বিজ্ঞান বলতে হলে এর কী কী যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন? এই প্রশ্নের উত্তর এই লেখায় আলোচিত হয়েছে।

লেখাটি খুব সহজে তুলে ধরার প্রয়োজনে নাথান এসেঞ্জ তাঁর Science versus Pseudo Science গ্রন্থে যে ১০টা যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন, সেগুলোর সহায়তা নিয়ে বিজ্ঞানের সাধারণ যোগ্যতা নিচে সাজানো হল:

  1. বিজ্ঞান হতে হবে পর্যবেক্ষণযোগ্য: আপনি বললেন মানুষ মারা গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। এই কথা পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়। কাজেই এটা বিজ্ঞান নয়। ডাঃ এলান  চালমার বলেন, "বিজ্ঞান হতে হবে আমরা যা দেখতে পারি, শুনতে পারি, ধরতে পারি ইত্যাদির ভিত্তিতে কোন কল্পনা কিংবা মতামতের ভিত্তিতে নয়।"(What Is This Thing Called Science?, চ্যাপ্টার ১)
  2. বিজ্ঞান হতে হবে যৌক্তিক: বিজ্ঞান-বিষয়ক যেকোন দাবী যৌক্তিক হতে হবে। যেমনঃ আপনি চোখ খুললে দেখেন, চোখ বন্ধ করলে দেখেন না। তাই এই সিদ্ধান্তে আসলেন, চোখ দ্বারাই দেখেন। আপনি কান বন্ধ করলে শব্দ শুনেন না, কান খোলা থাকলে শুনেন। এ থেকে সিদ্ধান্তে আসলেন যে, কান হচ্ছে শব্দ শোনার অংগ।
  3. বিজ্ঞানের দাবী হতে হবে সু-সংজ্ঞায়িত: বৈজ্ঞানিক দাবী সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকতে হবে। কী বলতে কী বুঝাচ্ছেন এটা একদম ক্লিয়ার থাকতে হবে। যেমনঃ হকিং-এর কোন সাক্ষাতকার অথবা লেখায় একটা গল্প পেয়েছিলাম। গল্পটি হলঃ একবার মিশরের রাজা পারস্য আক্রমণ করতে চাইলেন। তিনি গণকের কাছে গেলেন, যদি তিনি আক্রমণ করেন, তাহলে কী হবে। গণক উত্তর দিলেন, "বৃহৎ সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে।" রাজা মনে করলেন পারস্যের পতন ঘটবে। আক্রমণ করে হেরে গেলেন, আর পতন ঘটল মিশরের। গণকের কথা বাসী হইলেও ফলছে। কিন্তু গণকের কথা কি সু-সংজ্ঞায়িত ছিল? উত্তর, না। কারণ, কথাটা এমন ছিল যে, এমন হইলেও ঠিক হইবে, তেমন হইলেও ঠিক হইবে।
  4. বিজ্ঞানের তত্ত্ব Flsifiable (ভুল প্রমাণ করা সম্ভব) এবং পরিক্ষা করার উপযুক্ত হতে হবে: বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে ভুল প্রমাণের রাস্তা থাকতে হবে। আপনি এমন কিছু দাবী করলেন, যা ভুল প্রমাণ করার কোন উপায় নেই, সেটা বিজ্ঞান নয়। যেমনঃ মংগল গ্রহের অভিকর্ষীয় বল আছে। সেটা ভুল প্রমাণ করার রাস্তা আছে। আপনি মংগল গ্রহে কোন মহাকাশযান পাঠালেই দেখবেন যদি অভিকর্ষীয় বল থাকে তাহলে গ্রহের দিকে সেটা টানবে, যদি না থাকে সেটা গ্রহের দিকে টানবে না। এই কথাগুলিকে আরো সহজ করে বলা যায়, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে পরীক্ষা করার যোগ্যতা থাকতে হবে। যদি পরীক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেটা বিজ্ঞান না।
  5. বিজ্ঞানের পরিক্ষণ পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব: আপনি একবার একটা সেটআপ তৈরি করলেন। একটা ফলাফল পেলেন। আরেক বার যদি একই সেটআপ তৈরি করেন এবং যদি একই ফলাফল আসে তাহলে সেটা বিজ্ঞান। অর্থাৎ একই বিষয় বার বার পুনারাবৃত্তি করলে একই রেজাল্ট আসতে হবে। যদি একই রেজাল্ট আসে তাহলে সেটা বিজ্ঞান।
  6. বিজ্ঞান-বিষয়ক দাবী এমন হতে হবে যে, বাকি বিজ্ঞানীদের দ্বারা সেটা পরীক্ষা করা সম্ভব বা পরীক্ষিত হতে হবে: আপনি এমন কিছু একটা করলেন, যেটা শুধু আপনি করলেই সম্ভব হয়, অন্য কেউ একই কাজ করলে হয় না। তাহলে সেটা বিজ্ঞান নয়, সেটা জাদুবিদ্যা বা অন্য কিছু। বিজ্ঞান হতে হলে, অবশ্যই যেকেউ ঐ কাজ করুক, একই রেজাল্ট পাবে। যেমনঃ পীয়ার-রিভিউড জার্নালগুলিতে বিজ্ঞানিক প্রবন্ধ এমনভাবে লিখা থেকে যে, কী কী করা হয়েছে এবং কী রেজাল্টা পাওয়া গেছে, এবং তা এমনভাবে ব্যাখ্যাকৃত যে অন্য বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণভাবে চেক করতে পারেন।
  7. বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের যদি অস্পষ্টতা এবং ফাঁক থাকে, তাহলে ঐ ফাঁক সন্দেহের চোখে দেখতে হবে: কোন মডেলে যদি এমন কিছু দাবি করা হয়ে থাকে যা ব্যাখ্যা না করেই সিদ্ধান্তে চলে যাওয়া হয়েছে, তাহলে সেটা বিজ্ঞান নয়।
  8. বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে: বৈজ্ঞানিক তত্বকে প্রমাণ করার জন্য প্রতিটি পর্যবেক্ষণ খুব সাবধানে করতে হবে যাতে ভুল যত বেশী এড়ানো যায়। এবং উক্ত পর্যবেক্ষনগুলির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
  9. বিজ্ঞান হতে হবে উদ্দেশ্য-ভিত্তিক এবং এর নৈর্ব্যক্তিকতা থাকতে হবে: কোন কিছু প্রমাণ বা আগের কোন তত্বকে ভুল প্রমাণ অথবা কোন নতুন তত্ব বা নতুন জ্ঞান পাবার উদ্দোশ্যে বিজ্ঞান চালিত হবে এবং আগের পাওয়া যেকোন সিদ্ধান্তকে বাতিল করতে হবে যদি নতুন যতেষ্ট পরিমাণে প্রমাণ তথ্যাদি পাওয়া যায়। আবার, এমন কিছু করলেন, যেটার কোন অর্থ নাই। সেটা বিজ্ঞান নয়।
  10. Coincidence কোন প্রমাণ নয়: হঠাত কোন একটা প্রাণীকে দেখলেন প্রমাণিত ক্ষতিকর জীবাণু থাকা সত্ত্বেও সে ভাল আছে। এরকম একটা দুইটা ব্যতিক্রমকে কোন প্রমাণ হিসাবে বিজ্ঞান গণ্য করে না।
  11. Ancedotal Evidence-কে বিজ্ঞান প্রমাণ হিসাবে মানে না: একজন অতিপ্রাকৃতিক কিছু বর্ণনা করল, যা অন্যান্য এস্টাবলিস্ট বৈজ্ঞানিক ফ্যাক্টের বিপক্ষে যায়, তাহলে ঐ বর্ণনাগুলিও বিজ্ঞান নয়। তবে ঐগুলো অনুসন্ধানযোগ্য।
  12. ভবিষৎবাণী করার যোগ্যতা: আপনার দাবীকৃত বিষয় পর্যবেক্ষন করলেই হবে না, এর ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে হবে, এবং ঐ মডেলের ভবিষৎবানী করার যোগ্যতা থাকতে হবে এবং ভবিষৎবাণীর ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যবেক্ষন মিলতে হবে। যেমনঃ অভিকর্ষীয় বল প্রায় g = ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড এর বর্গ, গুন বস্তুর ভর। এটা আপনি পরীক্ষা করতে পারবেন, এবং এ ব্যাপারে ভবিষৎবাণী দিতে পারবেন। এই বিজ্ঞান ব্যবহার করে রকেটের গতি কী পরিমান হলে, পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রম করতে পারবে সেটাও হিসাব করতে পারবেন। তার মানে কোন কিছু দেখা না গেলেও যদি তার গাণিতিক মডেল থাকে এবং এই মডেলের আলোকে বাস্তব প্রয়োগ থাকে এবং ঐ প্রয়োগের ফলাফল যদি দেখা যায় এবং গাণিতিক মডেলের আলোকে যদি নির্ভুল ভবিষৎবাণী করা যায়, তাহলে তা বিজ্ঞান। 
  13. ব্যাখ্যা আর প্রমাণ দুইটা আলাদা বিষয়। কোন কিছুর ব্যাখ্যা কোন মডেলের সহায়তায় দেওয়া গেলেই ঐ মডেল বিজ্ঞান হয়ে উঠে না। কারণ এর পক্ষে প্রমাণ নেই।

 

কিছু বিবেচ্য বিষয়ঃ

  • Parsimony/Occam's razorঃ এই দর্শনের বিষয় হল, জটিল তত্ব গুলির মধ্যে অপেক্ষাকৃত সরল তত্বকে সঠিক বলে বিবেচনা করা হবে।
  • Deduction বা সিদ্ধান্তগ্রহনঃ এই দর্শনের বিষয় হল, আমরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি থেকে যৌক্তিক হিসাব নিকাশ করে সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারব। যেমনঃ আমরা যদি ঠিক এই সময়ের চাঁদের অবস্থান জানি, এবং চাঁদের গাতি কত সেটাও জানি, তাহলে একই সাথে সূর্যের অবস্থান সম্পর্কেও যদি পরিষ্কার ধারণা থাকে, তাহলে ঠিক কোন সময়ে সূর্যগ্রহন, চন্দ্রগ্রহন হবে, সেটা হিসাব করতে পারব।
  • প্রমাণের খুব জটিলতা ও অবোধ্যগমতা প্রমাণকে দুর্বল করে দেয়।

 

উপসংহারঃ কেউ কিছু বললেই সেটাকে বিজ্ঞান বলে চোখ বুঝে মেনে নেওয়া বিজ্ঞানের অপমান করা। কারণ এতে বিজ্ঞান বলে কিছু থাকে না। তাই, বিজ্ঞানের নামে কিছু আসলেই সেটাকে প্রশ্ন করা শিখতে হবে এবং বিজ্ঞান ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করা জানতে হবে।

কৃতজ্ঞতাঃ

Nathan Aaseng, Science versus Pseudo Science, 1994 Publisher: Franklin Watts.

Understanding Science, The Philosophy of Science, viewed 13 Nov-2014 from  http://undsci.berkeley.edu/article/philosophy

৬ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. মাহফুজ

    আল-কোরআন কি বিজ্ঞানময় গ্রন্থ?

    1. ১.১
      ফাতমী

      সময় নিয়ে পড়ে দেখব। ধন্যবাদ।

  2. শাহবাজ নজরুল

    বিজ্ঞানের এই কষ্টিপাথরের আলোকে ডারউইনবাদ  কিংবা বিবর্তনবাদকে কি বিজ্ঞান বলা যায়?

    1. ২.১
      ফাতমী

      @শাহবাজ নজরুল,

      -আপনিই বিবেচনা করে দেখেন। আপাত পাঠকের উপর ছেড়ে দিচ্ছি।

      -মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  3. mdmasumbillah

    ধন্যবাদ

    1. ৩.১
      ফাতমী

      মন্তব্যের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।