«

»

অক্টো. ২২

সব সৃষ্টি করলো যে জন তারে সৃষ্টি কে করেছে

ভূমিকা

অনেক সর্বেশ্বরবাদী, সন্দেহবাদী ও অবিশ্বাসীদেরকে কিছু চালবাজি প্রশ্নের চালাচালি করতে দেখা যায়। এসবের মধ্যে একটি হচ্ছে আল্লাহ যদি সব কিছু সৃষ্টি করে থাকলেন, তবে ‘আল্লাহকে সৃষ্টি করল কে’?

একটি অশুদ্ধ প্রশ্ন

এই প্রশ্নটি ‘আল্লাহ’ ও ‘সৃষ্ট বস্তু’ একই প্রকারের বলে ধারণ করে। সবকিছু যেহেতু সৃষ্ট তাই আল্লাহকে সৃষ্টি করল কে, এটাই প্রশ্ন এবং এতে এটাই নিহিত যে তিনিও যেন সৃষ্ট। এদিক থেকে প্রশ্নটির অর্থগত (semantic) ধারণা ভুল। ভুল। প্রশ্নকারী তার অন্তর্নিহিত (inherent/deep rooted) বিষয় নিয়ে বিভ্রান্ত (confused)। তাই সৃষ্টির সাদৃশ্যে ধরে নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহকে সৃষ্টি করল কে। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই প্রশ্ন-বাক্য এমন আকারের সংযোজিত ধারণায় উপনীত হল? কীসের ভিত্তিতে সৃষ্ট-বস্তু ও স্রষ্টা-জ্ঞানকে এভাবে প্রশ্নে রূপায়িত করা হল (construed the question in language)?

প্রশ্ন সাধারণত তার গঠন প্রণালীতে বর্ধিত ব্যাখ্যা বহন করে না। বরং অনেক প্রশ্ন ‘না-জানা’র প্রকৃতি বহন করে। আবার অনেক প্রশ্ন না বুঝেও গঠিত হয়, বুঝার আগ্রহে অথবা গানের ন্যায় মুখে মুখে চলা হিসেবে। আবার অনেকে নিজেদের প্রচার-প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবেও প্রশ্ন-বান তৈরি করেন। কিন্তু যখন দেখা যাবে কোন প্রশ্নের মধ্যকার পদ/পদসমূহ অসংগতি নিয়ে সজ্জিত হয়েছে (construed) তখন সেই আলোচনায় যাওয়াতে কোন লাভ নেই। কেননা সেখানে আলোচনার বা উত্তরের সঙ্গতিপূর্ণ পরিপ্রেক্ষিত অনুপস্থিত। এমন আলোচনায় সাধারণত কেউ কারও কথা শুনবে না, কেবল তর্কই করে যাবে।

আল্লাহ ও সৃষ্ট বস্তু

আল্লাহ হচ্ছেন সৃষ্টির ঊর্ধ্বের সত্তা, তিনি সৃষ্টির সমতুল্য নন। আমরা তাকে দেখি নি, তার কথা কানে শুনি নি, পঞ্চেন্দ্রিয়ে তাকে ধারণ করি নি। তাকে বিশ্বাসে পেয়েছি এবং ধ্যান-তপস্যায়, অনুভবে ধারণ করেছি। কেউ কেউ বিশেষ ধরণের যুক্তিতে পেয়েছি। কিন্তু তিনি পঞ্চেন্দ্রিয়ের বাইরে বিধায় বিশ্বের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভিন্ন মত এসেছে।

আমাদের বিশ্বাস মতে তিনি অনন্ত। তিনি কারও ‘মত’ নিন, সৃষ্টি থেকে আলাদা, ভিন্ন, সৃষ্টিসদৃশ নন, বরং ঊর্ধ্বের সত্তা। তাই আল্লাহকে কে সৃষ্টি করল এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলেই তাকে ‘সৃষ্ট-বস্তুর-মত” ধরে নেয়া হয়ে যায়। সৃষ্টির-মত সৃষ্ট তুলনা ঢুকে পড়ে। উল্লেখিত প্রশ্ন সেই তুলনার ধারণা বহন করে।

উদাহরণ: আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন? [এতে আল্লাহকে সৃষ্ট ভাবা হচ্ছে, অর্থাৎ প্রশ্নকর্তা হয়ত অবিশ্বাসী হয়ে গিয়েছেন, অথবা তার মাথায় ক্ষণিকের জন্য হলেও কৌতূহল (curiosity) কাজ করছে (আরো ব্যাখ্যার জন্য নিচের নোট দেখুন), বা তিনি আগ থেকেই পুরোপুরি অবিশ্বাসী, বা তিনি পৌত্তলিক বা পৌত্তলিক ধারণায় প্রভাবিত, তাই বস্তু-তুল্য ধারণার উন্মেষ হয়েছে]। কিন্তু এমন ব্যক্তির সাথে তার প্রশ্ন ও উত্তর চালাচালিতে গেলে, সেই প্রশ্ন ও উত্তর অনন্ত (infinite) ধারায় চলে যেতে থাকবে। কোনো লাভ হবে না।

উদাহরণ: ধরুন উত্তর দেয়া হল, ‘আল্লাহকে আরেকজন আল্লাহ বা এক নম্বর আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন’ (নায়ূযুবিল্লাহ)।

তারপর প্রশ্ন হবে তাহলে প্রথম আল্লাহকে কে সৃষ্টি করল? উত্তর, দ্বিতীয় আল্লাহ। দ্বিতীয় আল্লাহকে কে সৃষ্টি করল? তৃতীয় আল্লাহ, এভাবে প্রশ্ন ও উত্তর অনন্তে ঘুরপাক খাবে, কিন্তু এতে আল্লাহকে “সৃষ্ট” ধারণায় চালিত হবে, নায়ূযুবিল্লাহ।

লালন ফকিরের গান

অনেকেই জেনে থাকবেন, শিরোনামটি গৃহীত হয়েছে বাউল গায়ক লালন শাহের একটি পঙক্তি থেকে। পঙক্তিটি এভাবে:

“সব সৃষ্টি করলো যে জন
তারে সৃষ্টি কে করেছে
সৃষ্টি ছাড়া কি রূপে সে
সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে।”

আজকাল কিছু কিছু কথা লালনের নামে চালানো হয়, কিন্তু এগুলো কোন সঠিক উৎসে প্রাপ্ত তা বলা হয় না। লালন শাহের গান বাউল গান নামে পরিচিত হলেও তার গান তার নিজ নামেই বেশি পরিচিত যেমন লালনগীতি। তার গানের অনেক কথাতে মরমী ধারণা রয়েছে, যা চিন্তাশীল ব্যক্তির মনে চিন্তার উদ্রেক করে। তবে লালন ও তার মত আরও অনেক আছেন যাদের ধর্মমত ও বিশ্বাস সমাজের প্রধান প্রধান ধর্মীয় দলের বিশ্বাস ও আচরণ থেকে অনেকভাবে ভিন্ন। তাদেরকে স্পষ্টত হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ খৃষ্টিয়ান –এমনভাবে বুঝা যায় না। লালনের ধারণা আলোচনা করতে হলে আলাদা প্রবন্ধের দরকার। এখানে শুধু তার একটি পঙক্তিই প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ হচ্ছে মাত্র। পঙক্তিটি যেহেতু তার নয় বলে আমি জানি না, তাই অনেকের মত আমিও সেটি তার বলে মেনে নিয়েছি। এই পঙক্তিটি আবার অবিশ্বাসী ও সন্দেহবাদী মহলে বেশ আপ্যায়িত হয়।

লালন ও মানবতাবাদ

১৮ শো, ১৯ শো শতাব্দীতে মানবতাবাদী চিন্তা ইউরোপীয়দের মাধ্যমে ভারতে বেশ চলতে থাকে। তবে কিছু চিন্তা আগ থেকেও প্রচলিত ছিল। যেমন কবি চণ্ডীদাসের এই চরণটি, ‘শুন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ মূলত চিন্তার কোন নির্দিষ্ট ঘর নেই। চলন্ত ঝর্ণার মত তা কোন ধারায় গিয়ে কোন গর্তে প্রবেশ করে সেই হিসেব কেউ দিতে পারবে না। লালনের গানে প্রচলিত ধর্মীয় আকার-আকৃতির বাইরে অনেক কথা-বার্তা দেখা যায়। এজন্য অনেকে তাকে মানবতাবাদী চিন্তার লোক ভাবেন। তবে অবিশ্বাসীরা তাকে উল্লেখ করলেও তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। আবার এই বিশ্বাস নানান দিক থেকে প্রচলিত ধর্মের সাথে সাংঘর্ঘিক ছিল। আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিতে তার এই পঙক্তিটি স্পষ্টত সাংঘর্ষিক। এতে সর্বেশ্বরবাদী ধারণা পাওয়া যায়।

সর্বেশ্বরবাদ (pantheism)

ভারতীয় দর্শনের একটি ধারায় এই বিশ্বলোককে অনন্ত ধরা হয়ে থাকে। ১৯২০ এর দশকের বিগ-ব্যাং থিওরির আগ পর্যন্ত অনেক বিজ্ঞানীও অসৃষ্ট জগতের ধারণা পোষণ করতেন: এই জগত আগেও ছিল, এখনো আছে এবং আগামীতেও থাকবে। এখানে সৃষ্টি বলতে কিছু নেই। তবে এই বিশ্বাসের সাথে খোদার ধারণাও অনেকের কাছে এভাবে জড়িত ছিল যে তিনিই সব কিছুতেই বিদ্যমান। তিনি বিশ্ব-জগতের অংশ। এই ধারণা হচ্ছে সর্বেশ্বরবাদ (pantheism)। এটি হিন্দু দর্শনের একটি রূপ। ইউরোপের ডাচ (Dutch) দার্শনিক বারোখ স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭) এই দর্শনে বিশ্বাস করতেন। লালন শাহের উপরোল্লিখিত পঙক্তিতে সর্বেশ্বরবাদ প্রকাশ পায় বলে দেখা যায়। তিনি বলেছেন, ‘সৃষ্টি ছাড়া কি রূপে সে সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে’। অর্থাৎ এই বিশ্বলোক যখন সর্বকাল থেকেই আছে, যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অমনিতেই অনন্ত যেখানে সৃষ্টির প্রশ্ন নেই, ধারণা নেই, সেখানে সৃষ্টি না করে খোদা কীভাবে ‘সৃষ্টিকর্তা’ হলেন? তাহলে এদিক থেকে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? আমরা দেখতে পাচ্ছি এটা ইসলামী ধারণা নয় –হিন্দু ধারণা। কিন্তু একটি ধারণায় আবার কেউ সম্পূর্ণ হিন্দুও হয়ে যান না। ‘লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন- “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম’” (উইকিপিডিয়া)

তাহলে?

লালন একজন স্বশিক্ষিত লোক ছিলেন। স্বশিক্ষিতদের উপর অপরাপর চিন্তা-স্রোতের প্রভাব একটু বেশি পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় চিন্তার ইতিহাস, ধারাবাহিকতা ও যোগ-সংযোগের অনেক হিসেব-নিকেশ থাকে, যা স্বশিক্ষায় অনেক সময় হেরফের হয়ে পড়ে। লালন তার সময় ও সমাজের বিভিন্ন ধর্মীয় শ্রেণী থেকে নানান ধারণা গ্রহণ/বর্জন করেছেন, প্রভাবিতও হয়েছেন। এক্ষেত্রে তার এই পঙক্তিটি, আর যা’ই হোক, ইসলামী নয়। তবে এতে সর্বেশ্বরবাদী ধারণা প্রকাশ পেলেও তা অবিশ্বাসী বা সন্দেহবাদী নয়। এটাই তার পঙক্তির দ্বিতীয় অংশ বিষয়ক কথা। অতঃপর এই পঙক্তির প্রথম অংশের ধারণাটিও আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিতে অশুদ্ধ। কেননা, ইসলাম ধর্মে সৃষ্টির ধারণা রয়েছে। স্রষ্টা ও সৃষ্টি একত্রে জড়িত নন। স্রষ্টা বস্তুর অংশ হয়ে বস্তুতে নিহিত নন, বস্তুর সদৃশ বা তুলনায়ও নন।

মানুষের সমাজ জলাশয়ের মত যেখানে সগোত্রের সংস্রব বিচ্ছিন্ন হলে অপর গোত্রের উদরস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটা বিশ্বাসীদের খেয়ালে থাকতে হবে। আমাদের দেশে বাউল নামে পরিচিত মহলে তাদের নিজস্ব একটি ধর্মীয় ধারণা বিরাজ করে। ফলত তাদেরকে সহজে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টিয়ান এমন ধাঁচে ফেলা যায় না। তবে অবিশ্বাসী ও সন্দেহবাদী শ্রেণী তাদের সাথে বেশি জড়াজড়ি করতে দেখা যায়। তারা এদেরকে লাইম-লাইটে রাখে। কেননা অনেক আউল-বাউল মদ-গাজা সেবন করে, ধর্মীয় আচার-আচরণের বাইরে থাকে, বিপক্ষেও কথা বলে এবং ক্ষেত্র বিশেষে অসামাজিক/অনৈতিক কাজেও জড়িত থাকে। ধর্ম নির্মূলের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ শ্রেণী (অবিশ্বাসী ও সন্দেহবাদী) নিজেদের কারণেই এদেরকে প্রমোট করে। এদেরকে ঘিরে দেশ-বিদেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, মিডিয়া বিনোদনের উপকরণ পায় এবং তাদেরকে সমাজের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপন করে দেয়। তারা রোল-মডেল হয়ে পড়ে। ফলত নানান প্রকৌশলের তেলেসমাতিতে সংশ্লিষ্ট অনেক অনৈতিক কর্মকাণ্ড, কথাবার্তা, অর্থহীনতা ও অযৌক্তিতা সামাজিক পরিমণ্ডলে বিনোদনের আবহে অবচেনতবভাবে গৃহীত ও স্বাভাবিক হয়ে পড়ে।
_________________________

নোট:

একটি কথা আরও স্পষ্ট করতে চাই। এই ব্লগটি ফিতনাবাজদের সামনে রেখে লেখা হয়েছে, যারা নারিং-বিরিং করে অনবহিতদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু যাদের মাথায় অমনি অমনি এমন প্রশ্ন এসে যায় তারা এই ব্লগের উদ্দেশ্য নন। তাই সংক্ষেপে হলেও ব্লগের এক জাগায় এমন কথাও বলেছি যে কারো মাথায় হয়ত ক্ষণিকের কৌতূহল (curiosity) কাজ করে যেতে পারে। তাই এমনটি মাথায় আসলেই কারো বিশ্বাস চলে যায় না। শয়তান মানুষের মনে নানান প্রশ্নের ওয়াসওয়াসা জাগাতে পারে। হাদিসে এসেছে শয়তান বনি আদমের রক্ত-চলার ধারায় বিচরণ করে (إن الشيطان يجري من ابن آدم مجرى الدم)। আল্লাহর রাসূল (সা) এও বলেছেন, “মানুষ (নানান) প্রশ্ন করে করে এমন পর্যায়ে যেতে পারে যখন বলে উঠতে পারে, ‘আল্লাহ সব কিছু সৃষ্টি করলেন, কিন্তু আল্লাহকে সৃষ্টি করলেন কে?’ তারপর তিনি (রাসূল সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যাদের (মনে) এমন প্রশ্ন পায়, তারা যেন বলে, ‘আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম’ (আবু হুরাইরা (রা)/মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় সূরাহ ‘কুল হুয়া আল্লাহু আহাদ’ পাঠ করার কথাও এসেছে।

৭ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. মাহফুজ

    মহান আল্লাহ সকল সৃষ্টির স্রষ্টা। যিনি সর্বশক্তিমান, তিনি একক, স্বয়ংসম্পূর্ণ, যিনি কাউকে জন্ম দেন না এবং তিনি জন্ম নেনও নাই এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তাঁর ইচ্ছায় "কুনফাইয়াকু বলাতেই" তৎক্ষনাৎ সবকিছু সৃষ্টি হযে যায়। যদি কেউ তাঁকে সর্বশক্তিমান হিসেবে স্বীকার করার পরও এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে নিশ্চয় তার ইমানে ঘাটতি কিংবা বোঝায় ভুল আছে।

  2. মহিউদ্দিন

    আসলেই এ প্রশ্ন সন্দেহ-বাদীদের মনে জাগে যখন সে আল্লাহকে তাঁর (আল্লাহর) সৃষ্টির ভিতরে রেখে চিন্তা করতে শুরু করে। আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির বাহিরে রেখে চিন্তা করতে হবে। যেহেতু স্রষ্টার সৃষ্টির বাহিরে যাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয় তাই এরকম চিন্তা করা ভুল যে সেখানেও সৃষ্টি হতে হবে।

    এখন যেহেতু কম্পিউটারের যুগ তাই কেউ চাইলে এভাবেও বুঝার চেষ্টা করতে পারেন:

    মনে করেন আপনি ডিজিটাল ভুবনের এক সৃষ্টি (for example an object or program in Windows7 platform or an application in a computer world) সেখানে বাস করে আপনার কাছে Binary নম্বর অর্থাৎ 0 and 1 digit ছাড়া যে কিছু সৃষ্টি হয় বুঝা সম্ভব নয়। কারণ আপনার ভুবনের সীমাবদ্ধতা কম্পিউটার ভুবনের সৃষ্টির মত এক  সীমাবদ্ধ বিশ্ব ভুবনের ভিতরে। এর বাহিরে যাওয়া সম্ভব নয়। ঠিক যেমন সেই program বা application এর যে স্রষ্টা বা Programmer যার অস্তিত্বে যে zero and one digit এর কোন সম্পর্ক নাই সেটা program বা application এর পক্ষে বুঝা সম্ভব নয়। সে ভাবে স্রষ্টার সৃষ্ট এ বিশ্ব ভুবনে বাস করে তাঁকে কে সৃষ্টি করেছে সে প্রশ্ন অবান্তর কেননা সৃষ্টির কনসেপ্টটিই হচ্ছে সৃষ্টি-কৃত ভুবনের বিষয়ের ব্যাপার। এর বাহিরে কি আছে বা কি হতে পারে তা বুঝার ক্ষমতা সৃষ্টির ভুবনে বাস করে জানা যাবে না। তাই মুসলিমদেরকে বিশ্ব স্রষ্টা আল্লাহকে বুঝার জন্য কোরআনে সুরা "এখলাস" নাজিল হয়েছে আর সমগ্র মহাবিশ্বের উপর আল্লাহর জোরালো  ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব বুঝতে আয়াতুল কুরসী (আরবি: آية الكرسي‎) পড়তে হবে।

    এক আল্লাহতে বিশ্বাসী পৃথিবীর কোন ধর্ম গ্রন্থে (semitic religion) স্রষ্টাকে সৃষ্ট বলে কোথায়ও উল্লেখ নাই। যদিও বর্তমানে বিভ্রান্ত ক্রিষ্টানরা ঈসা (আ:) "খোদার পুত্র" হিসাবে দাবী করেন কিন্তু  বাস্তবে বাইবেলের কোথায়ও ঈসা (আ:) নিজেকে খোদার পুত্র হিসাবে দাবী করেন নাই এবং সে রকম কোন স্পষ্ট বক্তব্য  বাইবেলে তারা দেখাতে পারবে না। 

  3. সিফাত

    সংক্ষেপে কিছু কথা-

    ১) স্রষ্টাকে কেউ কি সৃষ্টি করেছেন?
    ২) একটি কলম কি কিছু সৃষ্টি করতে পারে?

    এই প্রশ্ন দুটোরই উত্তর ‘না’। কেননা কলমের কোন কিছু তৈরি করার ক্ষমতা নেই। আবার মানুষ কলম সৃষ্টি করে, মানুষের সে ক্ষমতা আছে। আবার মানুষও সৃষ্ট হয় এবং যৌক্তিক ভাবে মানুষের স্রষ্টা আছেন। কিন্তু স্রষ্টার স্রষ্টা কে অর্থাৎ সব কিছুর স্রষ্টা কে?

    এই প্রশ্নটা এরকম হয়ে গেল, কলম কি কিছু সৃষ্টি করতে পারবে?
    আমরা একদিকে বলছি স্রষ্টা(যিনি কেবল সৃষ্টি করেন, সৃষ্ট নন) এবং পরমূহুর্থে শর্ত দিয়ে সৃষ্ট হতে বলছি। এটা পরস্পর বিরোধী।

    এদিক থেকে অস্তিত্বধীন সকল কিছু তিন প্রকার।
    ১)স্রষ্টা (যিনি সৃষ্টি করেন, কারো দ্বারা সৃষ্টি হন না)
    ২)সৃষ্ট ও স্রষ্টা (কারো দ্বারা সৃষ্ট এবং সৃষ্টি করতে সক্ষম)
    ৩)সৃষ্ট (কারো দ্বারা সৃষ্ট কিন্তু সৃষ্টি করতে অক্ষম)

    কেন জানিনা লিখতে ইচ্ছা হল, তাই লিখলাম।আপনার লেখাটার জন্য ধন্যবাদ।

  4. এম_আহমদ

    [১] একটি কথা আরও স্পষ্ট করতে চাই।  এই ব্লগটি ফিতনাবাজদের সামনে রেখে লেখা হয়েছে, যারা নারিং-বিরিং করে অনবহিতদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু যাদের মাথায় অমনি অমনি এমন প্রশ্ন এসে যায় তারা এই ব্লগের উদ্দেশ্য নন। তাই সংক্ষেপে হলেও ব্লগের এক জাগায়  এমন কথাও বলেছি যে  কারো মাথায় হয়ত ক্ষণিকের কৌতূহল (curiosity) কাজ করে যেতে পারে। তাই এমনটি মাথায় আসলেই কারো বিশ্বাস চলে যায় না। শয়তান মানুষের মনে নানান প্রশ্নের ওয়াসওয়াসা জাগাতে পারে। হাদিসে এসেছে শয়তান বনি আদমের রক্ত-চলার ধারায় বিচরণ করে (إن الشيطان يجري من ابن آدم مجرى الدم)। আল্লাহর রাসূল (সা) এও বলেছেন, “মানুষ (নানান) প্রশ্ন করে করে এমন পর্যায়ে যেতে পারে যখন বলে উঠবে, ‘আল্লাহ সব কিছু সৃষ্টি করলেন, কিন্তু আল্লাহকে সৃষ্টি করলেন কে?’ তারপর তিনি (রাসূল সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যাদের (মনে) এমন প্রশ্ন পায়, তারা যেন বলে, 'আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম’ (আবু হুরাইরা (রা)/মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় সূরাহ ‘কুল হুয়া আল্লাহু আহাদ’ পাঠ করার কথাও এসেছে।

    [২] এপর্যন্ত যারা লেখাটি পড়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ এবং যারা মন্তব্যও করেছেন তাদেরকে বড় আকারের ধন্যবাদ।

  5. সজীব

    সুন্দর ও সহজবোধ্য লেখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনাদের বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ইদানীং দেখিনা কেন?

    1. ৫.১
      এম_আহমদ

      @সজীব:

      হ্যাঁ, ইদানীং বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা কম দেখা যাচ্ছে।  ব্লগ জগতে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার পিছনে সমাজ-রাজনৈতিক অনেক কারণ ছিল (এবং আছেও)। যেমন ধরুন যারা কট্টর বিবর্তনবাদী বা ধর্ম-নাশক চরমপন্থি অবিশ্বাসী তারা ধর্ম ও রাজনৈতিক যুদ্ধ করত বিজ্ঞানের আনুষঙ্গিকতায় বা ছত্রছায়ায় এবং এর পিছনে ছিল (এবং আছেও) একটি মহল যারা রাজনীতিতে প্রোথিত –যারা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তের নব্য ও সূক্ষ্ম আন্দোলনের হোতা। এদের কলমের মোকাবেলায় এসেছিল আরও কলম বরং বলুন অপেক্ষাকৃত উত্তম কলম।

      মানবিক কর্মকাণ্ড সাধারণত ‘ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া’ ভিত্তিক হয়। পরিস্থিতিতে পরিবর্তন সূচিত হলে কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিষয়টি হয়ত এভাবেই। একটি লেখা ছাপানোর পর অনেক মন্তব্য/প্রতিমন্তব্য করতে হয়। এতে লেখকদের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণাও প্রকাশ পেয়ে যায়। নানান কারণে আজকাল অনেকে লেখালেখি কম করছেন বলে দেখা যাচ্ছে। তবে আল্লাহই ভাল জানেন কেন কি হয়।

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।    

       

  6. মাহফুজ

    @সজীব:

    বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার প্রতি আপনার আগ্রহ আছে, তাই আপনাকে এখানে আমন্ত্রণ- আল-কোরআন কি বিজ্ঞানময় নয়?

Comments have been disabled.

  • -
  • +