«

»

ডিসে. ২৭

|| মুরতাদ || ধর্মে কি জবরদস্তি আছে?

-এক-

ধর্ম ত্যাগ

20161226-religion-exit-entry

ধর্ম ত্যাগের বিষয়টি সমাজ ও স্থানভেদে স্পর্শকাতর, জটিল ও ক্ষেত্র বিশেষে ক্যাচালও হতে পারে। এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র ও আইনের ক্ষেত্রে: “ধর্ম ত্যাগ: যার সাথে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধ ও দেশে ফিতনা ছাড়ানো জড়িত – الردة التي فيها محاربة الله ورسوله والسعي في الأرض بالفساد” এমনটি একটি ব্যাপক বিষয়। আমি এখানে হাল্কাভাবে কিছু কথা বলব। যে কয়টি কথা বলব তা আমার খেয়ালে যেভাবে এসেছে সেভাবে। এতে এক ব্যক্তির অব্জারবেশন ব্যতীত আর কিছু নয়।

মুরতাদ্দ

প্রথমে মুরতাদ্দ (مرتدٌّ) শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলায় যদিও আমরা দুটি দ (দ্দ)-এর পরিবর্তে একটি দ দিয়ে ‘মুরতাদ’ লিখি কিন্তু আরবিতে দুটি দ রয়েছে। এই শব্দটির মূল ক্রিয়াবাচক শব্দ হচ্ছে রাদ্দা-ইয়ারুদ্দু (ردَّ- يردُّ)। মানি কোন কিছু ফিরিয়ে দেয়া, প্রতিহত করা, বা কোনোকিছু দিয়ে তারপর ফিরিয়ে নেয়া। আরও অর্থ আছে তবে এই মর্মের। শব্দটি সকর্মক বা transitive. এটা যখন ৮ম ক্রিয়ারূপে (ইফতাআলার বাবে) ইরতাদ্দা-ইয়ারতাদ্দু (ارتدَّ- يرتدُّ) হয় তখন তা অকর্মক ক্রিয়া (intransitive/reflexive) এর বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। প্রথমে ছিল কোনো কিছু ফিরিয়ে দেয়া বা প্রতিহত করার ধারণায় কিন্তু এখন এসেছে নিজেই ফিরে যাওয়ার ধারণায়। এই ক্রিয়ার কর্তা (active participle/إسم الفاعل) হচ্ছে মুরতাদ, মানি যে ফিরে গিয়েছে। ধর্মীয় ধারণায় এর অর্থ হয় সে তার আগের ধর্মে ফিরে গিয়েছে। এই শব্দের ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য (verbal noun) হচ্ছে ইরতিদাদ (ارتدادٌ) এবং রিদ্দাহও (ردَّةٌ)। তবে রিদ্দাহতে সকর্মক ধারণা রয়েছে অর্থাৎ বিদ্রোহ করা, অপরকে ধর্ম থেকে ফিরানোর সক্রিয় তৎপরতা ইত্যাদি। বাংলায় কেউ কেউ এটাকে “রিজ্জাহ” লিখেন -এটা ভুল। আরবি না জানার কারণেই হয়। আজকের নাস্তিক কিন্তু আগের মুরতাদের অর্থের নয়। আগে যেখানে এক খোদা বা বহু খোদার ধর্মে ফিরার ধারণা ছিল এখন সেই ধারণা নেই। নাস্তিক কোনো পূর্ব ধর্মে ফিরে যায় না। এ দৃষ্টিতে তাদের জন্য মুলহিদ (مُلحدٌ/ধর্ম ত্যাগী, ধর্ম কটাক্ষকারী) পরিভাষাটি অধিক উপযুক্ত। পক্ষান্তরে নাস্তিকদের মধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে জোরাজোরি, সাংঘর্ষিক তৎপরতা, রাষ্ট্রীয় কলকব্জা, আইনসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাদের মতামত চাপিয়ে দেয়া ও ধর্মকে জোরে প্রতিহত করা এবং সীমা লঙ্গনের উদাহরণও বিস্তর পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে শাব্দিক দিক দিয়ে মুরতাদ যেহেতু বাংলায় প্রচলিত হয়ে গিয়েছে তাই এখানে সেভাবেই ধরে নেয়া হচ্ছে।

-দুই-

একজন বেদুইনের ধর্ম ত্যাগ

20161225-picture-of-a-bedouin
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ السَّلَمِيِّ، أَنَّ أَعْرَابِيًّا، بَايَعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الإِسْلاَمِ، فَأَصَابَ الأَعْرَابِيَّ وَعْكٌ بِالْمَدِينَةِ، فَجَاءَ الأَعْرَابِيُّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَقِلْنِي بَيْعَتِي‏.‏ فَأَبَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ جَاءَهُ فَقَالَ أَقِلْنِي بَيْعَتِي‏.‏ فَأَبَى ثُمَّ جَاءَهُ فَقَالَ أَقِلْنِي بَيْعَتِي‏.‏ فَأَبَى فَخَرَجَ الأَعْرَابِيُّ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّمَا الْمَدِينَةُ كَالْكِيرِ، تَنْفِي خَبَثَهَا، وَيَنْصَعُ طِيبُهَا ‏”‏‏.‏

জাবির বিন আব্দুল্লাহ আস-সালামি থেকে বর্ণিত যে এক বেদুইন রাসূল (সা) এঁর কাছে আসল এবং তাঁর হাতে ইসলামের বয়েত (অঙ্গিকার) গ্রহণ করল (অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করে আনুগত্যের অঙ্গিকার করল)। পরে, মদিনা শহরে সে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তারপর সে নবীর (সা) কাছে এল এবং বলল, ‘আমাকে আমার অঙ্গিকার থেকে মুক্ত করুন’ (অর্থাৎ আমাকে ইসলাম থেকে খারিজ করুন, ইসলাম থেকে সরে যেতে দিন)। রাসূল (সা) তা করতে অস্বীকার করলেন। তারপর সে আবার এল এবং বলল, ‘আমাকে আমার অঙ্গিকার থেকে মুক্ত করুন’। কিন্তু রাসূল (সা) তা করতে অস্বীকার করলেন। তারপর সে আবার এল এবং বলল, ‘আমাকে আমার অঙ্গিকার থেকে মুক্ত করুন’। এবারেও রাসূল (সা) তা করতে অস্বীকার করলেন। তারপর সে (নিজেই ধর্ম ত্যাগ করে মদিনা ছেড়ে) চলে গেল। 20161225-hadith-of-bellows তারপর রাসূল (সা) বললেন, ‘মদিনা হচ্ছে হাপরের (উনুনের বা জাঁতার) মত যা অপরিশোধিত/অপদ্রব্য সরিয়ে দেয় এবং উত্তম অংশ গড়ে (refines)’ (অপরিশোধিত/মিশ্র ধাতু অগ্নিতে পুড়ে যেভাবে তার মূল কাঙ্খিত ও অনাকাঙ্খিত অংশ আলাদা হয় সেভাবে। উৎস, বুখারি)।

এখানে প্রথমেই লক্ষণীয় যে নবী (সা) ধর্ম ত্যাগী বেদুইনকে হত্যার নির্দেশ দেন নি। আবার নিজেই তাকে পৌত্তলিকতায় ফিরিয়ে দেন নি কেননা পৌত্তলিকতার পৌরোহিত্য নিয়ে তিনি আসেন নি।

সেদিন মদিনার অবস্থা ও আবহ ভিন্ন ছিল। ওখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও ঘরে ঘরে নফল ইবাদত হত, সাহাবীগণ কোরান মুখস্থ করতেন, দীনি কথাবার্তা হত, বাচ্চা-বয়স্ক নির্বিশেষে অনেকেই ধর্ম চর্চা ও অনুশীলনে ব্যস্ত থাকতেন। এটা সেই আগের ইয়াসরিব নয়। বাইরে থেকে কেউ ইসলামের চৌকস কথা শুনে সরাসরি এই প্রাণকেন্দ্রে এসে পড়লে এটা অনেকটা হাপর বা জাঁতার মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত হতে পারত। অতি প্রত্যুষে ফজরের নামাজ, তারপর ধর্ম চর্চা, তারপর জীবিকা নির্বাহ, তারপর ধর্মীয় অন্যান্য রোটিন –এটা সকলের মেজাজে হঠাৎ খাপ খেয়ে উঠার মত ছিল না।

কিন্তু কারও কাছে এই ধর্ম মনঃপুত না হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে এমনটি তো হয় না। কোরান পাঠ করলে এই কথাটির সত্যতা দেখা যাবে। তবে রাসূল (সা) এঁর ওফাতের প্রাক্কালে এবং আবু বকরের (রা) সময়ে যে গোত্রীয় ও ব্যক্তিক ধর্ম ত্যাগের “আন্দোলন” বা “বিদ্রোহ” শুরু হয়, তার সাথে অনেক মিশ্র বস্তুর সংযুক্তি ছিল: ইসলামকে অঙ্কুরে বিনাশ করা, মদিনার কর্তৃত্ব উড়িয়ে দেয়া, সুদীর্ঘ ২৩ বছরে ধরে যা অর্জিত হয়েছিল তা ধ্বংস করা এবং গোত্রে গোত্রে আবার পৌত্তলিকতায় ফিরে যাওয়া। রিদ্দাহর যুদ্ধ (ইসলাম ত্যাগ ও নির্মূলের বিদ্রোহ) এসেছিল সেই প্রেক্ষিত থেকে।

-তিন-

ধর্মে জোরাজোরি নেই

বিশ্বাস মন থেকে আসতে হয়। এটা জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। আল্লাহ বলেন:

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّـهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّـهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

ধর্মে জবরদস্তি নেই। নিঃসন্দেহে সত্যপথ ভ্রান্তপথ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। অতএব যে তাগুতকে (আল্লাহ ছাড়া অপর উপাস্যকে [১]) অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্‌তে বিশ্বাস স্থাপন করে, সে একটি সুদৃঢ় হাতল ধারণ করে, যা ভেঙ্গে যাওয়ার মত নয়। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা (২:২৫৬)।

এই আয়াত নাজিলের কয়েকটি পটভূমি রয়েছে। একবার সিরিয়া থেকে এক দল খৃষ্টিয়ান ব্যবসায়ী মদিনায় তৈল বিক্রি করতে আসে। 20161225-oil-sellerব্যবসা-বাণিজ্য শেষ করে তারা যখন ফিরে যাবে তখন আবু হুসাইন নামক এক আনসারীর দুটি ছেলেকে খৃষ্টিয়ান ধর্মে দীক্ষিত করে তাদেরকে সাথে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। তাদের পিতা তখন রাসূল (সা) এঁর কাছে আসেন এবং তাঁকে লোক পাঠিয়ে ওদেরকে ফিরিয়ে আনতে আহবান করেন। কিন্তু নবী (সা) তাতে সাড়া দেন নি। এতে আবু হুসাইন দুঃখ পান। এই ঘটনায় এই আয়াত নাজিল হয়।

আরেকটি উদাহরণ। ইসলামের পূর্বে মদিনায় একটি প্রথা ছিল যে কোন মহিলার সন্তানাদি জন্মের পর যদি বার বার মারা যেত তখন এমন মহিলা এই মান্নত (প্রতিশ্রুতি) করত যে তার সন্তান বেঁচে থাকলে সে তাকে ইয়াহুদী ধর্মে দীক্ষিত করবে। কেননা তারা নিজেদের পৌত্তলিকতার চাইতে ইয়াহুদী ধর্ম উত্তম মনে করত। 20161225-banu-nadirএই সূত্রে গড়ে উঠা তাদের অনেক সন্তান ইয়াহুদী ছিল। মদিনা থেকে পরাজিত ইয়াহুদী গোত্র বনি নাদীর যখন নির্বাসিত হয়ে মদিনা ত্যাগ করছিল তখন যেসব মুসলিমদের ইয়াহুদী সন্তান নাদীরদের সঙ্গী হয়ে নির্বাসনে যাচ্ছিল তখন নবীর কাছে তাদের প্রস্তাব ছিল পিতা-মাতা হিসাবে সন্তানের উপর পূর্ব-প্রথার অধিকার ভিত্তিতে ওদেরকে তাদের ইচ্ছার প্রতিকূলে মুসলিম করে মদিনায় রাখতে দেয়া হোক। এই প্রেক্ষিতে আয়াতটি নাজিল হয়। অর্থাৎ এটা করা যাবে না। ধর্মে জোরাজোরি নেই।

কোনো একটি আয়াত একাধিক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। প্রাচীন বর্ণনাকারীরা যখন একাধিক প্রসঙ্গে একই আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন, তখন এর অর্থ হয় এই প্রেক্ষিতেও আয়াতটি প্রযোজ্য।

উদাহরণগুলো আল-কুরতুবির (১২১৪-১২৭৩) তাফসীর আল-জামি‘ লি আহকামিল কোরান থেকে গৃহীত। এমন আরও ঘটনা রয়েছে যেগুলো ধর্মে জোরজবস্তির বিপক্ষে কথা বলে।

-চার-

তাহলে ধর্মত্যাগীকে হত্যার নির্দেশ সম্বলিত হাদিসের ব্যাখ্যা কি?

একটি হাদিসে এসেছে যে যে ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করল, তাকে হত্যা কর (مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ)।

আমরা উপরে দেখেছি যে নবীর সামনেই এক ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে চলে গেল কিন্তু তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন নি। তাহলে এখানে বিষয় কি?

নবীর (সা) দাওয়াতের ২৩ বৎসর নানান ঝড়ঝঞ্জা, নির্যাতন, সমাজ ও দেশ থেকে বহিষ্করণ, সশস্ত্র যুদ্ধ এবং নানান ধরণের ষড়যন্ত্রে ভরপুর ছিল। প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল এই ধর্মকে নির্মূল করা এবং মুসলিমদেরকে তাদের পূর্ব ধর্মে ফিরিয়ে দেয়া। আল্লাহ বলেন, ‘আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশতঃ চায় যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কোন রকমে কাফের বানিয়ে দেয়’ (২:১০৯)। ‘আহলে-কিতাবের একদল চায় তোমাদেরকে বিপথগামী করে দিতে’ (৩:৬৯)। এভাবেই সেদিনের যুদ্ধ, কৌশল ও চক্রান্ত চলছিল। আর এক পক্ষের পরিকল্পনায় আসতে হয়েছিল আরেক পক্ষের পরিকল্পনা।

এক সময় ‘ধর্মে ঢুকা আর বের হয়ে যাওয়ার’ একটি খেলা মদিনায় আসে। এটা আহলে কিতাবদের উদ্ভাবনায়। এই খেলা বা চালবাজির রূপ হল তাদের কিছু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। তারপর ধর্ম ত্যাগ করে নিজেদের ধর্মে ফিরে যাবে। প্রকাশ্যে বলবে, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম বটে কিন্তু ভিতরে ঢুকে দেখতে পেলাম, সব ফাঁকা। বুঝতে পারলাম ওখানে ওহীও নেই জিব্রিলও নেই, সব বানোয়াট।

আমরা এবারে কোরানের বক্তব্য দেখে নেই:

قَالَت طَّائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ آمِنُوا بِالَّذِي أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا آخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

‘আর গ্রন্থপ্রাপ্তদের একদল বলে, ‘যারা ঈমান এনেছে তাদের কাছে যা নাযিল হয়েছে তাতে তোমরাও বিশ্বাস করো দিনের আগবেলায়, আর তার অপরাহ্নে প্রত্যাখ্যান করো, যাতে তারাও ফিরে যায়’ (৩:৭২)।

তাহলে এই তামাশার কি হবে? এটা তো বন্ধ হতে হবে। হয় কেউ প্রথমে বুঝে শুনে ভিতরে ঢুকবে, আর না হয় বাইরে থাকবে। কিন্তু খেলতে আসলে, এর পরিণতি ভুগতে করতে হবে। এভাবেই এই খেলাটি রাসূলকে (সা) বন্ধ করে দিতে হয়। ধর্ম খেল তামাশার বস্তু নয়। তাই এর মোকাবেলায় দণ্ডবিধি জড়িয়ে দেয়া হয়।

তবে উল্লেখিত হাদিসের আরও ব্যাখ্যা রয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (সা) একই সাথে নবী এবং রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন। “ধর্ম ত্যাগ: যার সাথে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধ ও দেশে ফিতনা ছাড়ানো জড়িত” এমন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহ, ফিতনা ও সামাজিক অপকর্ম সবই সংযুক্ত হয়ে আসতে পারে যেখানে রাষ্ট্র প্রধান বা আদালতের কাজি নির্ধারণ করবেন কোথায় কোনখানে কীভাবে কোন কোন বস্তুর অধিক্রমণ ঘটেছে। যেমন উরইয়ানীদের ধর্ম ত্যাগের সাথে হত্যা, ধর্ষণ ও ডাকাতির সংযুক্তি ছিল। আবার উল্লেখিত বেদুইনের ধর্ম ত্যাগে কিছুই ছিল না। অবশেষে এই কথাটি সংযোগ করে লেখাটির সমাপ্তি টানছি যে ইসলামের যুদ্ধ, সন্ধি, আইনের প্রয়োগ, প্রত্যাহার ইত্যাদি আইনি প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিত্তিতে হতে হয়। কোথাও কোনো একক ব্যক্তি আইনকে তার নিজ হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি নেই। কেননা এতে সামাজিক বিপর্যয় বা ফিতনা সৃষ্টি হয় এবং এই ফিতনা যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকেও অধিক ক্ষতিকর হয়।

_______________________________________

20161225-para-heading-6

[১] তাগুত হচ্ছে এমন কোনো এক বা একাধিক প্রভাবশালী শক্তি, সত্তা, বস্তু, বা প্রক্রিয়া/পদ্ধতি যা মানুষকে এক আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিরত রাখে। প্রকৃতিতে, বিপরীত ধর্মী বস্তুর ভিত্তিতে যে ভারসাম্য সৃষ্টি হয় অথবা কোনো বিশেষ পরিমাণ/পরিমিতির ভিত্তিতে যে ভারসাম্য আসে, সেই ভারসাম্য যা ভেঙ্গে দেয় বা সীমা অতিক্রম করে তা’ই তাগুত। তাছাড়া কল্যাণ প্রতিরোধকারী ও মন্দের প্রসারক সব কিছুই তাগুত; আল্লাহ ছাড়া যা কিছুর উপাসনা করা হয় তা’ই তাগুত, শয়তানও তাগুত। ব্যাকরণবিদ সীবয়াইহ ও অন্যান্যদের দৃষ্টিতে এটি generic noun (إسم الجنس) যা এক বচন ও বহুবচনে ব্যবহৃত হতে পারে। উভয় লিঙ্গে ব্যবহৃত হতে পারে। এটা رَهَبُوت , جَبرُوت ইত্যাদি শব্দ-আকৃতির ন্যায়। তবে ব্যাকরণবিদ আন্নুহাসের (النحاس) দৃষ্টিতে তা طغي ক্রিয়ার মাসদর (مصدر /verbal noun) তুগইয়ান (تغيان) থেকে উদ্ভাবিত। তাগা (طغي) হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা।

এই শব্দের সারফ (صرف) বা পরিবর্তনের রূপ হচ্ছে এভাবে: প্রথমে ছিল فعلوت এর ওজনে طغيوت। তারপর শব্দের ইয়াকে (ي) সংরক্ষণ করতে গাইনের (غ) এর অগ্রবর্তী করা হয়। এতে فعلوت এর ওজনে طيغوت হয়। তারপর সাধারণ নিয়ম ও উচ্চারণের সুবিধার্থে ইয়াকে (ي) আলিফে (ا) রূপান্তরিত করা হলে তা হয় طاغوت ( নিসানুল আরাব-অভিধান )।

৫ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. ফাতমী

    অনেক গুরুত্বপূর্ন পোস্ট। সময় নিয়ে মন্তব্য করতে হবে।

    1. ১.১
      এম_আহমদ

      @ফাতমী: ঠিক বলেছেন। অনেক বিষয়ে যেখানে যুক্তি সংগত মন্তব্যের দাবী থাকে সেখানে সময় নেয়াই যুক্তিসংগত। অনেক ধন্যবাদ।

  2. মাহফুজ

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ-
    এই আয়াতগুলো (৫:৫৪, ৪৭:২৫ – ৩২, ও ৩:১৪৯) লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোন বিশ্বাসী/ ইমানদার মানুষ স্রষ্টা প্রদত্ত জীবনবিধান থেকে (يَرْتَدَّ) মুখ ফিরিয়ে নিলে বা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে অবিশ্বাসী হয়ে গেলে সেই ব্যক্তিকে মুরতাদ বলা যেতে পারে। এরূপ মুরতাদ অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা যদি বিশ্বাসীদের ক্ষতির কারণ না হন এবং কোন অন্যায় ও অশান্তি সৃষ্টি না করে বিশ্বাসীদের সাথে সন্ধিতে আবদ্ধ কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকতে চান, তাহলে তাদের জন্য কোন শাস্তির বিধান নেই। তবে তারা শয়তানের অনুচর এবং পরকালে তাদের জন্য চরম শাস্তির কথাই বলা হয়েছে।

    তবে (৪:৮৯) নং আয়াত অনুসারে অবিশ্বাসীদের মধ্যে এমনও কেউ থাকতে পারে যারা সরাসরি বিরোধীতা না করলেও তাদের দল ভারি করার জন্য চুপিসারে বিশ্বাসীদের মাঝে থেকে (মুনাফিক রূপে) কুমন্ত্রণা দিতেই পারে। তাই বিশ্বাসীদেরকে তাদের সংসর্গ এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে তাদের এরূপ বিরোধী তৎপরতা থেকে ফিরে আসার জন্য সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও তারা তাদের অপতৎপরতা বন্ধ না করলে এবং বিশ্বাসীদের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত থাকলে এই ধরনের বিদ্রোহী অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার এবং প্রয়োজনে হত্যা করার কথাও বলা হয়েছে।

    1. ২.১
      এম_আহমদ

      @মাহফুজ:

      প্রথমে পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সার্বিকভাবে আপনার সাথে একমত। তবে একটি স্থানকে আরেকটু প্রশস্ত করতে পারলে হয়ত ভাল হয়, তাই করছি। আজকাল যদিও নাস্তিকের ব্যাপারে মুরতাদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে কিন্তু এতে এই শব্দের প্রাচীন অর্থ নেই। প্রাচীন অর্থে (এবং শাব্দিক অর্থেও) ‘পূর্বাবস্থায় ফিয়ে যাওয়া’, ‘পিছনের দিকে ফিরে যাওয়া’ –এই ধারণা। আমি এটাই বলতে চেয়েছি। জন্মসূত্রে কোনো মুসলমান যেহেতু ইসলামে ‘প্রবেশ’ করে না, তাই তার জন্যে ‘প্রত্যাবর্তন’ এর ধারণাও নাই। সে শুধু ধর্ম পাল্টায় (يبدل دينه)। তবে কোনো নাস্তিক যদি আস্তিক হয়ে পুনরায় নাস্তিক হয়, যেভাবে সেকালে কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারপর আবার ধর্মত্যাগ করেছিল, তারপর আবার ফিরেছিল/বা ফিরে নি (এমন অর্থে, ৪:১৩৭) এমন প্রেক্ষিতে শব্দটির অন্তর্নিহিত প্রত্যাবর্তনের ধারণা ঠিক থেকে যায়। আমি শুধু ভাষাতাত্ত্বিক দিকই আলোচনা করছি। প্রাচীন ব্যবহারিক দিক। তবে বর্তমানে কোনো একটি শব্দ অন্যভাবে ব্যবহৃত হলে তাও ভাষাতাত্ত্বিক দিকের অন্তর্গত হয়। এদিক থেকে কেউ আল্লাহর ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তাকে যদি মুরতাদ বলা হয় তবে এটাও আধুনিক অর্থের অন্তর্গত হবে।

      তবে যে অর্থে কোরানে ‘ইরতাদ্দা’ ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়েছে তাতে ফিরার ধারণা নিহিত। আগের অবস্থায় ফিরার। যেমন ইয়াকুব (আ) এঁর মুখে ইউসূফের জামা স্থাপন করা হলে তাঁর দৃষ্টি পরিবর্তনের অলৌকিকতাকে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, ‘ইরতাদ্দা বাছীরা’ (১২:৯৬) ‘তিনি ফিরলেন চক্ষুষ্মান অবস্থায়’। অর্থাৎ ‘পূর্বের দৃষ্টিমান অবস্থায় ফিরে গেলেন’। ঠিক এভাবে মুসা (আ) ও তাঁর অনুচর যখন বুঝলেন যে পাত্র থেকে মাছটি অনেক আগেই বেরিয়ে গিয়েছে তাই উভয়েই যখন সেই স্থানটি অনুসরণ করতে ‘ফিরলেন’ তখন তা এভাবে বলা হল, “ইরতাদ্দাা আলা আসারি-হিমা কাসাসা” (১৮:৬৪) তারা (দুজন) ‘ফিরলেন’ পদাঙ্ক অনুসরণ করে। সুতরাং ক্রিয়ায় প্রত্যাবর্তনের ধারণা স্পষ্ট। ৫:৫৪ ও ৪৭:২৫ আয়াতে তা’ই রয়েছে। তবে ৩:১৪৯ আয়াত ভিন্ন। এর ক্রিয়া হচ্ছে رد- يرد -যা সকর্মক। এতে আছে ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ ধারণা।

      এটাও ঠিক বলেছেন যে বিশ্বাসী সমাজ ব্যবস্থাকে ছিন্ন-ভিন্ন করণের যুদ্ধ ও অশান্তি বিস্তারের কার্যক্রম না থাকলে তাদের শাস্তির বিধান নেই। তবে বিশ্বাসীরা এদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।

      ইমাম গাজ্জালির বরাত দিয়ে মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতা সম্বলিত প্রায় ২০০ খানি আয়াত কোরানে উল্লেখ আছে বলে বলা হয়। যদিও তা দেখার সুযোগ আমার হয় নি তবে আমরা অনায়সেই অনেক আয়াত দেখতে পাই। যেমন ধর্মে জবরদস্তি নেই। নিঃসন্দেহে সত্যপথ ভ্রান্তপথ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে (২:২৫৬)। বস্তুত আমরা তাকে (মানুষকে) দুটি পথ দেখিয়েছি (৯০:১০)। আপনি বলুন এই সত্য তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে আগত। যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক আর যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক (১৮:২৯)। আপনার প্রভু যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা আছে, তাদের সবাইকে ঈমানদার করে ফেলতে পারতেন। সুতরাং আপনি কি মানুষের উপর জবরদস্তী করবেন তাদের ঈমান আনার জন্য (১০:৯৯)? আপনি তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক (ক্ষমতা প্রয়োগকারী) নন (৮৮:২২)। আপনি বলুন, তোমাদের জন্য তোমাদের দীন, আমার জন্য আমার দীন (১০৯:৬)। অতঃপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমাদের উপর (৮৮:২৬)।
      তবে মানব সমাজে ধর্মীয় বাড়াবাড়ির এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এ যুগে মৌলবাদী নাস্তিকরা ধর্মীয় বাড়াবাড়ির সেই ইতিহাসে শরীক হয়েছে।

      আবারো ধন্যবাদ। ভাল থাকুন।

      1. ২.১.১
        মাহফুজ

        বিস্তারিত জবাব দেয়ার জন্য ধন্যবাদ-
        এ বিষয়ে এখানে কিছু বলার চেষ্টা করেছি- 10) The rights of Non-Muslims / অমুসলিমদের অধিকার
        লিংক- https://sites.google.com/site/everlastingheavenlylight/middle-way-is-the-best-madhyapantha-i-uttama/10-murtad-nastik-according-to-al-qura-n-ala-kora-anera-drstite-muratada-o-nastika

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।