«

»

মে ২৭

নেতৃত্ব

নিশ্চয়ই নেতৃত্ব একটি মহৎ, কঠিন ও জটিল কাজ। আর শুধুমাত্র  সাহসী ও জ্ঞ্যানী লোকদের পক্ষেই সম্ভব এই কঠিন  ও জটিল কাজটি বাস্তবে পূর্ণত্ব করা। সেই সাহসী, যে অন্তরের সব রকমের বিষময় তিক্ততা-কে ধৈর্যশক্তির মাধ্যমে প্রতিহত করে এবং নিজের অন্তর-কে সর্বদা কোমলতার পাত্রে ধারণ করে। প্রকৃত জ্ঞ্যানী সেই, যে চিন্তাশক্তি ও অনুভূতির মাধমে নিজের “আমি”-কে জানে এবং প্রতিটি ক্ষণ নিজের অস্তিত্ব-কে অনুভব করে। আর নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে জ্ঞ্যান ও সাহস-কে নিজের ভিতর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দরিদ্রতার সাথে বসবাস অপরিহার্য। দরিদ্রতাকে সাহসের সাথে আলিঙ্গন না করলে, জাতিকে নেতৃত্ব এবং মানবীয়  গুনাবলি ও নৈতিকতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞ্যান অর্জিত হয় না। নিজের   কুপ্রবৃত্তিগুলো জানুদ্বয়ের মধ্যে দাবিয়া রেখে দুঃখ, দুর্দশা, ক্ষুধা ও অভাবের জগতে  ঢুকে ধৈর্যের সিংহাসনে নিজের “আমি”-কে শাসক রূপে প্রতিষ্ঠা করে। সকল কামনা, বাসনা ও খেয়ালখুশি থেকে নিজেকে দূরে রাখে এবং সরলতার জীবন যাপন করে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট হৃদয়াঙ্গম করে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের ভিতরে “আত্ম-সংযম” ও “নিঃস্বার্থ ত্যাগ”-কে স্থাপন করে। চারিত্রিক বিশুদ্ধতা, সত্যবাদিতা, নম্র স্বভাব, বিবেক সম্পন্ন শিষ্টাচার, কঠোর কর্তব্য পরায়নতা, সূক্ষ্ম বুদ্ধি সকল গুনাগুন কথা ও কর্মের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এবং সেই সাথে দেশ ও সমাজের মানুষদের অন্তরে  এক আদর্শ  হিসেবে স্থান করে নেয়। জগতের ভাল-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ, সত্য-মিথ্যা গুলো চিহ্নিত  করে এবং এদের প্রভাবে সৃষ্ট সুবিধা ও অসুবিধাগুলোকে জানে। সে নিজেকে জনকল্যাণের  জন্য আত্মনিয়োগ করে এবং নম্রতার ব্যক্তিত্ব-কে পরিধান করে। দেশের মানুষদের জন্য দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তির পথ খুজে, চিন্তা  করে ও চিন্তায় মশগুল থাকে এবং তাদের ভিতর থেকে বদলিয়ে দিয়ে, মানবীয় গুনাবলি ও নৈতিকতা  পূর্ণাঙ্গভাবে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকে। আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে দেশ ও সমাজের সমস্যাগুলো যে ভাবে সমাধান করা উচিত, তা সঠিক ও উপযুক্ত ভাবেই সম্পন্ন করে। দেশের মানুষদের এক শান্তির বলয়ে আবদ্ধ করে, সাম্য বন্ধনের মই তৈরি করে উপরে আরোহণের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ মৃত্যুর ভিতরে নিজ জীবনকে অতিবাহিত করে এবং “ত্যাগ” ও “ক্ষমা”-র মাধ্যমে নিজ চিত্ত প্রশান্তি অনুভব করে। নিজের কথা ও কর্মের হিসাব নিজেই গ্রহন করে এবং নিজেকে সংশোধন করে আর ইহাই নেতৃত্বর মাপকাঠী।    

একটি উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশ ও দরিদ্র্যযুক্ত জাতির জন্য নেতৃত্বের এই জটিল ও কঠিন কাজটি নারীজাতির পক্ষে সম্ভবপর হয় না। বিপুল পরিমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে  নেতৃত্ব দিতে যে  ধৈর্য, সাহস, জ্ঞ্যান বা শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার প্রয়োজন, সৃষ্টির নিয়মেই নারীজাতিকে কোনটির পূর্ণতা দেওয়া হয়নি। নারী নেতৃত্বকে যারা বৈধ মনে করে বা সরাসরি সমর্থন দেয়, তাদের এক দল নিজেদের কামনা, বাসনা-কে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যেই করে এবং খুব সহজেই উদ্দেশ্য সফল করে, আর অন্য দলের নারী  নেতৃত্বের ভয়াবহতা সম্পর্কে জ্ঞ্যান নেই।

অর্থ ও সম্পদ যখন জীবনের  প্রয়োজনের তুলনায় অধিক হয়ে উঠে তখন সমাজের এক শ্রেণীর নির্বোধ পূর্ণাঙ্গভাবে নিজেদের রিপুর দ্বারা চালিত হয়। কু-প্রবৃত্তি সমুহ তাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। পারিবারিকসূত্রে এবং উচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতালোভীদের সংস্পর্শে সৃষ্ট রাজনীতিবিদরা একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে এই নির্বোধেরা মেয়র বা সংসদ সদস্য-র দৌলতে নেতৃত্ব-কে গ্রহন করে, তারপর আকাঙ্ক্ষা করে নিজেদের অবস্থান থেকে উপরের দিকে।  নেতৃত্বের সুবিধা সমূহের শাখা-প্রশাখা অনেক হলেও, এর প্রধান কারন দুটি। এক, অল্প সময়ে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমান অর্থ ও  সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেয়। দুই, মানুষদের উপর নিজের কর্তৃত্ব ও খেয়াল-খুশির প্রাধান্য।  এই কর্তৃত্ব  ও খেয়াল-খুশির সাথে যখন মিশ্রণ ঘটে জিদ আর অহংকার, তখন নিজের  চিন্তাশক্তি ও অনুভূতির কাছে তার  ভিতরের “আমি”-র পুরুপুরি বিলুপ্তি ঘটে, আর বাহিরের “আমি” এমনি স্তরে পৌঁছে, সে নিজেকে প্রভু ভাবতে শুরু করে। আর ইহাই এইসকল  নির্বোধদের আত্মতৃপ্তির সর্বোচ্চ স্তর। এই আত্মতৃপ্তি তাদের অন্তরে বিশ্বাসের শিকড় গজিয়ে দেয় যে, মৃত্যু কখনো তাদের স্পর্শ করবে না। এই “প্রভুত্ব” মজা সামরিক, বেসামরিক সকল শ্রেণীর নির্বোধদের অন্তরে যখন একবার ছোঁয়া লাগে, তখন তারা হয়ে উঠে বেপরুয়া। নেতৃত্বের পদটুকু পাওয়ার জন্য মারামারি, কাটাকাটি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা পাইকারি দরে হত্যা করতে মহা উদ্যমের সাথে চড়াও হয়। 

লোভ ও সম্পদ জমা করার নেশা অন্তরের ভিতরে এক ধরনের কম্পনের সৃষ্টি করে। এই কম্পনের আলোড়নের দরুন এই নির্বোধেরা মৃত্যু যন্ত্রনার ন্যায় সর্বদা অস্তিরতা অনুভব করে। তারা জানে না কিভাবে নিজ অন্তর-কে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, শুধু জানে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিস্তার নেই। অন্তরের এই অস্তিরতার কম্পন বন্ধ করার জন্য ক্ষমতা ও টাকার প্রভাব খাটিয়ে তারা যা খুশী তাই করে। মানুষের জীবনের মূল্যবোধ তখন তাদের থাকে না, সকল মানবীয় গুনাবলি ও নৈতিকতাকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে। শোষন ও অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে মানুষের আর্তনাদ এবং অন্তরজ্বালা ও শিহরিত কষ্টের সাথে  খায়েশ মিটানোর তান্দবলীলার খেলা করে। নিজের ভুল ও সমালোচনা অপরের মুখ থেকে শুনা মাত্রই বিষাক্ত গর্জনের সাথে তেড়ে আসে, সাথে থাকে ক্ষমতা ও সন্ত্রাসীদের দাপট। এদের স্বভাব অত্যন্ত কঠিন বদ-মেজাজী প্রকৃতির। দেশ সেবার নাম করে তারা ভোগ-বিলাসিতায় মগ্ন এবং স্বার্থের কঠিন অনুশীলন ও প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। সময়ের পরিবর্তনের সাথে, তাদের মধ্যেই ক্ষমতার জামা বদল হয় এবং যে যখনই  ক্ষমতার গদিতে বসে, তখনি সে নিজেকে ভাবতে শুরু করে  মহাঞ্জানী, মহান সংস্কারক, সবজান্তা রূপে আর দেশটাকে পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে। সে আরও মনে করে ইহাই তার প্রাপ্য ছিল।  নিজেদের সুবিধামত আইন তৈরী ও পরিবর্তন করে আর দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলার উপর বিশৃঙ্খলার জাল বপন করতে থাকে। পূর্ববর্তীদের উন্নয়নশীল কাজ বন্ধ করে আর নিজেদের মনগড়া ও জিদ মিটিয়ে কার্য পরিচালনা করে। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যে যেভাবে পারে অপচয় ও নষ্ট করছে আর লুটপাট চালাচ্ছে। নিজেরা নিজেদের ভিতরে হিংসাকে লালন-পালন করছে আর মিথ্যা, লোভ, ঈর্ষা, ক্রোধের ইন্ধনের  দ্বারা সেই হিংসার আগুনই বৃদ্ধি করছে। ক্ষমতাকে পাওয়ার নেশায় এই হিংসার  আগুনে নিজেদের ভিতরের পশুত্ব স্বভাবকে আরো ধারালো করে দেশ ও  দেশের মানুষদের জীবন নিয়ে একে অপরের সাথে আত্মতৃপ্তির খেলায় মেতে আছে। চেহারায় বিনয়ী ও ভদ্রতার ভান করলেও প্রকৃতপক্ষে, এদের অন্তর ব্ল্যাকহোলের অভিকর্ষ বলের মতই ভয়ংকর ও কঠিন। আর কিভাবে নিজেকে মজা লাগানো যায়, কিভাবে অর্থ ও সম্পদের পাহাড় বানানো যায়, কিভাবে নিজের খ্যাতি ও কতৃত্বকে বাড়ানো যায়, কিভাবে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখা যায়, কিভাবে এই সমস্যাবহুল ও উচ্ছৃঙ্খল সমাজে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায়, সর্বদা কুচিন্তা ও কুকর্মে হয়রান ও পেরেশান থাকে।  বস্তুত, গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে তারা তাদের ঢাল রূপে ব্যবহার করে। লজ্জা-শরম কি, তা এইসকল নির্বোধদের জ্ঞ্যান ও অনুভূতিতে নেই। সর্বক্ষণ “খাই-খাই খাই-খাই” ধান্ধাবাজীতে ব্যস্ত। এই আস্ত পৃথিবীটা স্বর্ণ বানিয়ে খাওয়ালেও পেট ভরবে না, তাদের পেট তখনি ভরবে যখন মুখের ভিতর “মাটি” দিয়ে চাপা দেওয়া হবে।

দেশ ও সমাজের গঠনগত কাঠামোতেই ফুটে ওঠে নেতা-নেত্রীদের অদক্ষতা, অপরিকল্পনা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দুর্নীতি,  কর্তব্যকর্মে অবহেলা ও উদাসীনতা আর তাদের চামচেদের লুণ্ঠনের রাজনীতি। নিজেদের অহমিকা ও খেয়াল-খুশির সাথে দেশ পরিচালনার দরুন দেশব্যাপী এক অশান্তির আবরণে ঢেকে গেছে আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বহগুনে  বাড়ছে দুর্ভোগ। প্রতিদিন জনগন জীবনযাত্রার সর্বক্ষেত্রে যে পরিমাণ হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হয়, তা যদি এইসকল নেতা-নেত্রীদের ভোগ করতে দেয়া হয়, তাহলে শুধুমাত্র আত্মহননের পথই খোলা থাকবে। কারন তারা পারে না, চরম বাস্তবতার মোকাবেলায় অন্তরের তিক্ততার উপর ধৈর্য ধারণ করতে আর কখনই চাইবে না প্রভুত্ব স্তর থেকে মাটিতে নামতে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ  জনগন পারছে না নিজের ও জীবনের মৌলিক প্রয়োজনটুকু মিটাতে। চারিদিক থেকে অদৃশ্য লেলিহান অগ্নিতে তাদের বুকের অলিন্দ-নিলয় জ্বলছে, পুড়ছে, ছারখার হচ্ছে। অন্তর দহনের তীব্র যন্ত্রণা এইসব নেতানেত্রীদের পাষান হৃদয় গলে না। তাদের অন্তরের দরজা বন্ধ। আত্মতৃপ্তির কঠোর প্রহরী দ্বারা সেই বন্ধ দরজাকে আরও মজবুত করে রেখেছে। উচ্চাবিলাষী  আর জিদের দ্বারা শুধুমাত্র নিজেদের “আত্মতৃপ্তি”-র পরিধিকে বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যেই  স্বাধীন  দেশের নাগরিকদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে এক অস্তিরতার অশান্তির যন্ত্রণার ভিতরে ডুবিয়ে রেখেছে। নিঃসন্দেহে “ক্ষমতার নেশা” নেশা জগতের সর্বনিকৃষ্ট, বৃহত্তর এবং ব্যাপক।

“দেশের সকল রাজনৈতিক দলের এইসমস্ত প্রবৃত্তি-পূজারী নেতানেত্রীরা নিজেদেরকে আত্মতৃপ্তির কুণ্ডলী থেকে বের করে পশুত্ব স্বভাব বর্জন করে কখনই মনুষ্যত্বে ফিরে আসবে না এবং এদের দ্বারা দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে না”  ইহা সত্য, যেমন সত্য “জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ  করিবে”। জনগনের শান্তি ও কল্যাণের উদ্দেশ্যেই সাহসী ও  জ্ঞ্যানী লোকদের দেশ ও জাতির নেতৃত্ব-কে গ্রহন করা ছাড়া আর  কোনো উপায় খোলা নেই।

৪ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. মোঃ তাজুল ইসলাম

    যারা নিজের অন্তরের কুপ্রবৃত্তিসমূহ বশীভূত করে রাখে তারা জানে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কত কঠিন? এই বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত  রাষ্ট্রপতি ও প্রধান মন্ত্রির পদে সৎ ও যোগ্য লোক, কাউকে পায়নি।

  2. এম ইউ আমান

    শাহাবুদ্দিন সাহেবকে কি রাষ্ট্রপতি পদে সৎ ও যোগ্য লোক বলা যাবে না? তাজউদ্দিন আহমেদ কি তেমন কোন অসৎ কাজ করেছেন? তিনি তো মনে হয় যোগ্য ও ছিলেন।

  3. মোঃ তাজুল ইসলাম

    @এম ইউ আমান,
    ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।
    ক্ষমতায় থাকাকালীন সামাজিক প্রেক্কাপটের আবরণে সততার কাজকর্মের ছাপ পাওয়া গেলেও, সেটাকে প্রকৃতপক্কে সততা বলা যায় না। তবে তাজউদ্দীনের প্লাটফর্ম ভিন্ন, শাহাবুদ্দিন থেকে। প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহন করে দেশের বাইরে, তারপর অর্থমন্ত্রী এবং শেষে অহংকারী মুজিবের দ্বারা অপসারণ। দুজনেই ছিলেন প্রবৃত্তিপূজারী। বিলাসিতার ভীতরে থেকে কেউ যোগ্য হতে পারে না।

  4. SK BASAK

    Thanks tajul vai.. Apner lekha ta pore nije ekto tripti pelam, apnader moto manush aro porimane barte habe, noito tike thaka somvob na!!!! Ei  chinta chetona amra vule jai jokhon hate thake sokol khamota!!!! Amder ei desh k develop korte hale age amader sokol k shikhito hate habe… eta korte hale education k aro develop korte habe.. seta korte habe primary porjai theke..!!!
     
     

Comments have been disabled.