«

»

Mar ২৭

সিলেট ভ্রমন, শাহজালাল আর সহনশীলতা

আ-রে ভাই, বাড়ি যাওয়ার সময় চন্দ্রার কাছে বিশাল লম্বা জামে পরলাম। রাত দেড়টা পর্যন্ত চন্দ্রাতেই। তারপর ঘুমিয়ে পরি, ভোরে উঠে দেখি যেই জায়গায় ছিলাম, সেখানেই আছি। বাস ১ ইঞ্চিও আগায় নাই। শালা চু… ড্রাইভাররা এই বিশাল প্যাচ লাগায়া রাখছে। আইন-কানুন কিছু মানে না। যেখানেই ফাক পায়, সেখানেই ঢুকায়া দেয়। জাম কি হালার এমনি-এমনি হয়? ২য় জনঃ আরে ভাই আমি একবার সারারাত পাটুরিয়াতেই কাটিয়ে দিলাম, হেই পাড় আর যাইতে পারলাম না। অনেক গাড়ীর লাইন। এই হা… ফুতেরা মানুষ না, কুত্তা-বিলাই। সাথে আরো কিছু অভিজ্ঞতার গল্প বলতে লাগলেন।

আমার পিছনে দাঁড়ানো দুই ব্যক্তির কথোপকথন। দাঁড়িয়ে আছি ট্রেনের টিকিট লাইনে, সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেসের জন্য। পিছনে দাঁড়ানো দুই ব্যক্তি ট্রাফিক পুলিশ, ড্রাইভারদের গোষ্ঠী উদ্ধার করতেছেন নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতার দ্বারা। বাসের উপর তাদের ভরসা নেই, ট্রেন-ই যাতায়তের জন্য ভাল। তাদের কথাপোকথন কানে আসছে। আসল সমস্যা তো… ট্রাফিক, ড্রাইভার নয়। আসল সমস্যা জানতে হবে। ৪৭ বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছে। রাস্তাঘাট এই দীর্ঘ সময়ে কতটুকু উন্নত হয়েছে? আমরা বাঙালী জাতি বংশবৃদ্ধিতে যথেষ্ট উদ্যমী। জনসংখ্যা এই দেশে ভাইরাস-ব্যক্টেরিয়ার মত বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে, সেই তুলনায় রাস্তা কতটুকু সম্প্রসারিত এবং সংস্কার হয়েছে? কি পরিমান গাড়ি বৃদ্ধি হয়েছে বিগত সময়ে? তার উপর দেশে লেগে আছে মরন ব্যাধি ক্যান্সার “দুর্নীতি”। দুর্নীতি দেশের উন্নয়নকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়। রাস্তাঘাট-সহ দেশের সকল উন্নয়ন আটকে থাকে যখন দুর্নীতি পাকাপোক্তভাবে অবস্থান করে। আমাদের দেশটাও সেই দুর্নীতি দিয়ে মোড়ানো। শুধু শুধু ট্রাফিক পুলিশ আর ড্রাইভারদের দোষ কেন?

লাইনে সামনে ৫০ জনের মত মানুষ হবে কিন্তু লাইনের মানুষজন এগোচ্ছে শামুকের চেয়েও ধীর গতিতে। সরকারী বেশীরভাগ চাকুরীজিবীগন কর্তব্য-কর্মে সৎ নন। তাদের মধ্যে সততা নেই। শাশুড়ীর কাছ থেকে পাওয়া খাটি সরিষার তেল পশ্চাতদেশে ঘণ্টায় ঘণ্টায় না মাখলে তারা কেদেরায় বসে আরাম পান না। আর ঠিক জায়গায় আরাম না হলে, তারা কাজ করতে পারেন না। আর কাজ যেটুকু করেন, তা শামুকের চেয়ে ধীর গতিতে। যখন মালের গন্ধ পান, তখনই কেবল তাদের কাজের গতি আসে। ৩ ঘন্টা লাগল, কাউন্টারে পৌঁছাতে। আমাদের যাওয়ার দিন শুক্রবার কিন্তু কাউন্টারে এসে জানলাম শুক্রবারে টিকিট নেই। ৫ দিন আগেই ট্রেনের সব টিকিট শেষ। জানালেন, বৃহস্পতিবারের টিকিট আছে। পরিবারের স্ত্রী/বোনদের সদস্যদের নিয়ে সিলেট ভ্রমন। আগে কখনও সিলেট তারা যায়নি। বাচ্চারা সবাই আশা নিয়ে আছে, তারা জাফলং দেখবে। স্কুলের সহপাঠী, প্রতিবেশীদের হয়ত বলেই ফেলেছে, তাদের আনন্দময় ভ্রমনের কথা। শুক্রবারের টিকিট নেই এই অজুহাতে ভ্রমন ক্যানসেল করলে তাদের মন হবে অত্যান্ত বেদনাদায়ক। বাচ্চাদের বিরাট এক আশা ভঙ্গ করা, আনন্দ নষ্ট করা ঠিক হবে না বিধায় বৃহস্পতিবারের টিকিট-ই নিয়ে নিলাম।

কমলাপুরে যথাসময়ে উপস্থিত হলাম টিম নিয়ে। ট্রেন যথাসময়ে কমলাপুরের প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করল। টিমের স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। তাদের হাসি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, কথা উপভোগ করাই আমার শান্তি। কিন্তু সেই শান্তি বেশীক্ষন স্থায়ী হয়নি। বিমানবন্দর আসা মাত্রই অদ্ভুত শব্দের সহিত মানুষ ট্রেনে উঠতে লাগল। অনেকটা বিচলিত হয়ে যাই, কারন আমাদের টিমে আমি একমাত্র পুরুষ, বাকী সব মহিলা, মেয়ে এবং শিশু। কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা সবাই একত্রে যখন কিছু আক্রমন করে, তখন এই ধরনের শব্দ হয়। মানুষ উমড়ি-ধুমড়ি/বিচ্ছৃঙ্খল করে ট্রেনে উঠতে লাগল। যে যেমনে পারছে, সেভাবেই উঠার চেষ্টা করছে। অনেক মহিলা, শিশু সেই ভীড়ের মাঝে। অবাক হলাম। এখনতো ঈদ নয়, তাহলে এত ভীড় কেন? পরে জানা গেল, শুক্র-শনি-রবি লাগাতার বন্ধ। সবাই দেশে যাওয়ার জন্য ঢাকা ত্যাগ করছে। ট্রেনের ভিতরে এত মানুষ ঢল এমনই হল যে, মৌমাছির চাক হয়ে আছে। যে সকল যাত্রীর টিকিট আছে, তারা তাদের সিটে যেতে পারছে না, ভিতরে এতটাই ভীড়। বিমানবন্দর ছেড়ে ট্রেন টঙ্গির পর পুবাইল স্টেশন পার হয়ে গেছে, তারপরও অনেক যাত্রী তার নির্দিষ্ট সিটে আসন নিতে পারেনি। মানুষের চাপে আমার মত অনেকেরেই ঘাড় কাত হয়ে থাকতে হচ্ছে। এইভাবে থাকলে, কিছুক্ষনের মধ্যে ঘাড় ব্যথা শুরু হয়ে যাবে। জিজ্জেস করি দাঁড়ানো যাত্রীদের, কেন রিজার্ভেশন নেই? জানাল, তাদের টিকিট আছে কিন্তু সিট নেই। তারা দাঁড়িয়েই যাবে। পকেট ভরার জন্য ট্রেনের সকল যাত্রীদের ভুগান্তী কোন স্বাধীন দেশের লক্ষন প্রকাশ করে না। স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করার একটা নিয়মনীতি থাকা উচিত। অগনিত মানুষদের টিকিট দিয়ে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে দায় সাড়া কোন সুস্থতা নয়। আমার পাশে এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে বাচ্চা কোলে নিয়ে। বাচ্চার কান্নায় মহিলার দিকে তাকালাম। জিজ্ঞেস করি, কোথায় যাবেন? বলল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সিট থেকে উঠে তাকে বসার সুযোগ করে দিলাম। টঙ্গির এজতেমার আখেরী মোনাজাতের পর যানবাহনে উঠলে যে অবস্থা হয়, অনেকটা সেই রকম আমাদের ট্রেনের কোচটি।

পুরুষ, অল্প বয়সের ছেলেরা যেভাবে মেয়ে মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে, এতে করে নিজের সাথে থাকা মা-বোনদের নিয়ে কোথাও যাওয়া অস্বস্থিকর পরিস্থিতিতে পরতে হয়। এদের তাকানো দেখে বুঝা স্বাভাবিক, মেয়ে মানুষ ভিন গ্রহের প্রানী, জীবনে দেখে নাই। আর তাকানো স্টাইলও শকুনের দৃষ্টি। তাদের এই শকুন দৃষ্টির ভিতরে কি থাকে, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। “লজ্জ্বা-শরম” অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ ব্যাপার না। এই দেশের দেশ প্রধান, মন্ত্রী, আমলা, কামলাদের নুন্যতম জ্ঞান এই বিষয়ে নেই। এই শকুনের দৃষ্টির মাধ্যমে একটা দেশ ও জাতির রুচির পরিচয় ফুটে উঠে, তা কি দেশ প্রধানরা জানে? মানুষ খালি এরশাদ কাকুরে বিশ্ব-বেহায়া কয়। বাঙালী জাতিটাই একটা বিশ্ব-বেহায়া (অল্প সংখ্যক ব্যতীত)। এই বিশ্ব-বেহায়ার সমাধান রাষ্ট্র থেকে করতে হবে, নয়ত এটা কোনদিন বদলাবে না। সদালপে হিজাব এবং নিকাব নিয়ে অনেক লিখা আছে। অনেক ভাই তাদের মতামত জানিয়েছেন। আমি মনে করি, কঠোর শাস্থির মাধ্যমে হয় রাষ্ট্র থেকে এই শকুনের দৃষ্টি বন্ধ করতে হবে নয়ত পুরা দেশ ও জাতির মানুষদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে নয়ত মেয়েদের নিনজা হতে হবে। মেয়েরা/মহিলারা শুধু মাথা ঢেকে মুখ বের করলে, শকুনের দৃষ্টি কখনই বন্ধ হবে না।

দাঁড়িয়ে আছি আর ভাবছি- বাসে করে আসা হয়নি বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে। তারা ট্রেনে ভিতর নড়াচড়া করবে, হাটাহাটি করবে, খুলাখুলি ভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে কিন্তু এখন কোথায় কি? জান বাঁচানো কষ্ট হচ্ছে। হায় কপাল! আনন্দ ভ্রমন এখন নরক যন্ত্রনা। এই নরক যন্ত্রনার কথা স্বপ্নেও মনে উদয় হয়নি। হঠাৎ এক চিন্তা মনে উদয় হওয়ায় ভীষণ অস্থির হয়ে উঠলাম। এখন যদি কেউ বলে উঠে, “বাথরুমে যাব”, তাহলে ইহা শুনা মাত্রই আমি অজ্ঞ্যান হয়ে যেতে পারি। ট্রেনের ভিতরে এখন যে পরিস্থিতি, এই অবস্থায় বাথরুমে যাওয়া আর আসমানের চাঁদ পাওয়া একই জিনিষ। আল্লাহ-কে স্মরণ করতে থাকলাম।

ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমপুর, মনতলা, নোয়াপারার পর ট্রেনের ভিতর স্বাভাবিকতা ফিরে আসল। মানুষজন নেমে গেল যেতে থাকল। শ্রীমঙ্গলের পর স্ট্যান্ডিং আর নেই। শুকরিয়া। আমিও স্বাভাবিক হলাম। সম্পূর্ন স্বাভাবিক। এখন কেউ বাথরুমের কথা বললে, সমস্যা নেই। বাচ্চাদের সাথে উচ্ছ্বাসে যোগ দিলাম। টিমের কয়েকজন বাচ্চাদের মধ্যে ২ জন ভিকারুন্নেসায় পড়ে, অথচ তারা জন্মের পর কখনও ঢাকার বাহিরে যায় নাই।

সিলেট পৌছলাম দুপুর ২-টায়। স্টেশনে নামাজ আদায় করে টিম নিয়ে এবার হোটেল খোজ করার পালা। গন্তব্য দরগা। দরগায় গিয়ে অভিজ্ঞতা হল আরেক সিনেমা-নাটক। যে সকল ডাবল রুমের ভাড়া সাধারণত ৫০০/৬০০ টাকা, সেগুলো এখন ১০০০/১২০০/১৫০০ টাকা। লম্বা ছুটি বা উইকেন্ডের কারনে এটা একটা সিন্ডিকেট ব্যবসা। দরগার সব হোটেলের একই চিত্র। রুম চাইলেই, প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, আপনার সাথে কে? যখন শুনে মহিলা, তারা তাদের খেয়াল-খুশী কথা বলে এবং রুমের দাম হাকায় যা মন চায়। যখন বলি একা, তখন বলে- রুম নেই। মহিলা-বাচ্চারা সাথে আছে বিধায় আমিও নিরুপায়। দীর্ঘ জার্নি করার পর, সবাই ক্লান্ত। বাংলাদেশ ছাড়া এমন ডাকাতি/বেকাদায় পরিস্থিতি আছে কিনা, তা জানা নেই।

বিকালে এবং রাতে গেলাম দরগার শাহজালাল মাজার। মাজারের গেটটি দেখতে ভালই লাগল। ঢুকার আগে দোকানীরা তাদের কাছ থেকে চকলেট জাতীয় মিষ্টান্ন কিনার জন্য ডাকাডাকি করতে থাকল। কাছে গেলাম। জিজ্ঞেস করি, এইগুলা কিনে কি হবে? বলল, ২ পেকেট কিনে ভিতরে নিয়ে যান, ভিতরে হুযুর তবাড়ক করে দিবেন। জিজ্ঞেস করি, তবাড়ক কি? তবাড়ক মানে দোয়া। হুযুর দোয়া করে দিবেন। এক পেকেট হুযুর রেখে দিবেন, আরেক পেকেট আপনি নিয়ে যাবেন, বাসায় গিয়ে সবাইকে খাওয়াবেন। জিজ্ঞেস করি, যিনি দোয়া করে দিবেন, উনি কি মুসলমান? কথাটা শুনে ভ্রু-তে ভাজ পরল দোকানীর। পরে বলে উঠল, এটা কি কন? (দোকানী সিলেটি ভাষায় কথা বলছেন, আমি সেভাবে এই লিখায় প্রকাশ করতে না পারায় দঃখিত। তবে সিলেটি ভাষা শুনতে ভাল লাগছিল) উনি মুসলমান হইব না কেন? বলি, এই সকল হুযুরদের দোয়া কি ফায়দা হবে? তাদের দোয়া যদি কাজই হত, তাহলে তো সে নিজে নিজের জন্য দোয়া করে কোটিপতি হয়ে যেত। মানুষদের জন্য “দোয়া”-র উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে হত না। ঠিক কিনা? দোকানী কোন কথা বলল না। আরো বলি, দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে বড় পীর হলেন, নিজের মাতাপিতা।

মাজার গেটের ভিতরে গিয়ে যা দেখলাম, আমার কাছে শির্ক এবং ধর্ম ব্যবসা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। পাগল-ছাগলদের আড্ডাখানা, ধান্ধাবাজদের আনাগোনা। অনেক মানুষ না বুঝে শির্ক করছে। মনে হল, সাধারণ মুসলিমদের জ্ঞান নেই এই মাজার সম্পর্কে। সাধারণ মানুষজন লোক মারফত আজগুবি/অলৌকিক কথা শুনে এই মাজার পরকালের মুক্তির উপায় এমন একটা ধারনা করে আছে। মানুষজন এখানে দুনিয়া চাইতে আসে, দুনিয়ার পেরেশান কমানোর জন্য আসে। মুরগী, ছাগল, টাকা…… প্রচুর পরিমানে আসেতেছে। এই বিদাত বন্ধ করা জরুরী।

রাতে গিয়ে দেখি, মাজারের ভিতর থেকে আসা হুযুররা সেই চকলেটের পেকেটগুলা দোকানীদের সাপ্লাই দিচ্ছে, যেগুলা সাধারণ মানুষ ভিতরে তবাড়ক করার জন্য হুযুরের কাছে রেখে আসেন। ভিতরে দেখি, সেই লালনের ভক্ত অনেক সন্ন্যাসী (তাদের দেখে আমার লালন অনুসারী মনে হল)। তাদের সাথে অনেক মহিলা। মহিলাদের হাতে অনেক সাদা পুটলা, তারা এক ব্যাগ থেকে আরেক ব্যাগে ঢুকাচ্ছেন। আমায় দেখে এক মহিলা সাবধান হয়ে গেলেন। বুঝলাম, এই সাদা পুটলা গুলা গাঁজা। পীর-মাজারের সাথে গাঁজা-র সম্পর্ক অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত।

মাজারের অফিসে গেলাম, চেষ্টা করি কথা বলতে। কেন এই ফেরকাবাজ? অফিসের লোকদের সাধারণ মানুষদের সাথে আচরন লক্ষ্য করলাম, আমার আর রুচি হয়নি তাদের সাথে কথা বলার। ধারনা করি, আমার কথা বলার সাবজেক্ট শুনা মাত্রই আমার উপর আক্রমন হবে। তাদের এই আরাম-আয়েশের জীবিকার উৎস নিয়া কথা বললে, তারা তো আমায় আস্ত রাখবে না।

মসজিদের পাশে এক বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হল, তিনি মাজারের কোন লোক। কাছে গিয়ে সালাম দিলাম। জিজ্ঞেস করি, এই মাজার কেন তৈরী হল? আমি শাহজালালের নাম শুনেছি কিন্তু তার সম্পর্কে কিছু জানি না। বললেন, শাহজালাল এই দেশে এসেছেন বলেই, এই বাংলাদেশে মুসলিম আছে, নয়ত এই দেশে মুসলমান হইত না। বলি, আমাদের নবী(স) স্বয়ং তার চাচা আবু তালিব-কে মুসলমান বানাইতে পারেন নাই, আর শাহজালাল কেমন করে বাংলাদেশের সকল লোকদের মুসলমান বানাইলেন? বললেন, শাহজালালের কারনেই বাংলাদেশ মুসলমান হইছে। শাহজালাল ছিলেন উসিলা। “তোমরা উসিলা তালাশ কর (কোরান)” । মনে মনে বলি, এই আয়াতটাই সকল পীর-মুরিদেরা অন্যতম প্রধান অস্র হিসেবে ব্যবহার করে। বলতে লাগলেন, শাহজালাল যখন সিলেটে এসে আযান দেন, তখন গৌর গবিন্দের ৪ তলা ভবন ভেঙ্গে পরে যায়। গৌর গবিন্দ শাহজালালের ক্ষতি করার জন্য ঝাড়ি(সাপ রাখার বাসকেট)-তে করে আসে, তখন শাহ জালাল বলেন, গবিন্দ তুমি ঝাড়িতে করে এসেছ, তুমি আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আরো বললেন, শালজালাল জায়-নামাজে করে সুরমা নদী পার হয়ে ছিলেন। জিজ্ঞেস করি, এই ঘটনাগুলোর সত্যতা কি? সত্য হিসেবে গ্রহন করার উপায় কি? বললেন, তর্ক নয়। যার ইচ্ছা বিশ্বাশ করুক। আমাদের কথাপোকথনের মাঝে এক গোফওয়ালা এসে হাজির হলেন (খানদানি গোফওয়ালা, রাবন মার্কা গোফওয়ালা। এই রকম গোফওয়ালা তামিলনাডু-তে দেখতে পাওয়া যায়)। বলি, নবী(স)-র কলিজার টুকরা ফাতিমা(রা) কিভাবে মারা গেছেন? জানেন কি? তার কবর চিহ্নিত করা আছে কি? তিনি কথা বললেন না। গোফওয়ালার উপস্থিতি সুবিধা মনে হচ্ছে না, বৃদ্ধ লোকটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্থান ত্যাগ করি।

পৃথিবীর প্রায় সকল নবী-রাসুলগন মেষ চড়িয়েছেন। মেষ চড়ানো অনেক ধৈর্যশীলের কাজ। মেষদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুশীলন সহনশীলতা বৃদ্ধি করে। ছোট একটি দল নিয়ে সিলেট ভ্রমনে গিয়ে নিজের সহনশীলতার পরীক্ষা করার সুযোগ হল। মহিলা এবং বাচ্চাদের মেজাজ এবং কাজকর্মের উপর নিজেকে মেলে ধরলাম। রাতে সবাইকে খুব শক্ত করে ছবক দেওয়া হল, আমরা সবাই সকাল ৮ টায় জাফলং-র উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাব। কেউ যেন দেরী না করি। অথচ হোটেল থেকে বের হলাম সাড়ে দশটায়। এই বাচ্চা কান্না করতেছে, ওই বাচ্চা গোছল করতেছে, আরেকজন বিছানা ছাড়লেও চেয়ারে বসে আবার ঘুমাচ্ছে, একজনের পেট খারাপ, কেউ সাজতে ব্যস্ত…… আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। এই পরিস্থিতিতে মেজাজ কন্ট্রোল করা কঠিন। রেস্টুরেন্টে গিয়ে সবাই সবার পছন্দমত খাবার অর্ডার করল, কিন্তু খাবার আসার পর বলে উঠল আমি এটা খাব না, আরেকটা খাব- এই বলেই চিৎকার। যখন বড় বড় বিপদ উপস্থিত হত, মেজাজ খুবই খারাপ হত, নবী-রাসুলগন চুপ হয়ে বসে পরতেন, চোখ বন্ধ করতেন, মনযোগ স্থাপন করতেন অন্তরের সাথে। অন্তরের ভিতর যে ঝড়-তুফান বইতে থাকে, তার সাথে ধৈর্য-র মাধ্যমে খুজতেন আমিত্ব-কে। আমিও তাই করার চেষ্টা করি। চোখ বন্ধ করলাম কিন্তু পারতেছি না। যতবার চোখ বুঝি, ততবার একটাই মনে হচ্ছে- আমি আমার চেয়ার ছেড়ে উঠে সেই চেয়ার নিয়ে ওর মাথায় বারি দিয়ে ওর চিৎকার বন্ধ করি। অন্তরে ঝড়-তুফান বইতেছে…… ভ্রমন আর তিক্ততার কথা নাই বলি। মেয়ে মানুষ সাথে থাকলে, আশপাশের মানুষ পাঠা বানিয়ে ফেলে। মানুষ সব ধান্ধায় থাকে, কিভাবে মাল বের করানো যায়? জাফলং-এ এবং অন্য জায়গায় আরো কষ্টদায়ক অনুভূতি এবং বেকাদায় পরে ছিলাম। স্ত্রী ও বোনদের কল্যানে কিছুটা পরিত্রাণ পেয়েছিলাম।

“তোমাদের কি ধারনা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ্‌ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল (৩:১৪২)”- বড়ই গভীর চিন্তার আয়াত। নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত… দিয়ে জান্নাতে যাওয়ার আশা যারা করেন, তারা ওলীক জগতে বসবাস করেন এবং আমিও তাদের একজন। আরো আত্মনিয়োগ করতে হবে। এই দুনিয়াকে পিছনে নিক্ষেপ করতে হবে। এই দুনিয়া থেকে পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে পরকালের জন্য। অন্তরে দুনিয়াকে ধারন করলেই সব কর্মফল নষ্ট। আমলনামা শুন্য।

ভ্রমনের জন্য যা বাজেট করেছিলাম, তার ডাবল খরচ হয়েছে। আমার জন্য ইহা ছিল কষ্টদায়ক। সোনার বাংলার মানুষদের অন্তর সোনা দিয়ে তৈরি, তাই কষ্ট হয়েছে। চিন্তা করি, এখন যদি বাংলাদেশে যুদ্ধ লাগে, তাহলে কতজন পাওয়া যাবে দেশের জন্য প্রান দেওয়ার? চারিদিকে যে চরিত্রের পরিচয় পাই, তা তো সব যুদ্ধপরাধী বলে মনে হয়। সবাই লোটপাট করবে, দেশকে বিক্রি করবে, ধর্ষন করার জন্য ঝাপিয়ে পরবে।

আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া, টিমের সকল-কে কিছুটা হলেও আনন্দ দিতে পেরেছি।

১১ comments

Skip to comment form

  1. 10
    Mamun Ahmed

    অধিকাংশ মাজারেই প্রকাশ্যে শির্ক করা হয়,হয়ত একদিন এটা বন্ধ হবে যেদিন ইসলামের বিজয় আসবে।
    * তাজুল ভাই, কিছু মনে করবেন না @জিয়া ভাই,সালাম” এভাবে না বলে,@জিয়া ভাই,আস-সালামু আলাইকুম” এভাবে বললে বেশী ভালো হয় না?

  2. 9
    ফাতমী

    সহনশীলতা নিয়ে বেশী কিছু লেখেন নাই!

  3. 8
    শামস

    @মোঃ তাজুল ইসলাম:

    শিক্ষা সেটা ধর্মীয় বা সেক্যুলার হোক এই শিরককে অনেক কমিয়ে আনতে পারে। আমার মনে হয়েছে, গত কয়েক দশকে এই মাজারগামী এই শির্ক অনেক কমে গেছে। অপরদিকে হঠাৎ করে বেশি ধার্মিক হতে গিয়ে একটা অংশ হয়ে যাচ্ছে চরমপন্থী, অবশ্য এই ধার্মিক হঠাৎ হওয়ার অনেক অনুঘটক আছে, যা সংক্ষিপ্তাকারে বলা সম্ভব নয়. আবার বেশি সেক্যুলার হতে গিয়ে আরেকটা অংশ হয়ে যাচ্ছে ধর্মবিমুখ এবং খুব ছোট একটা অংশ ধর্মবিদ্বেষী। গত দুইশো বছর আগে তাকালে দেখা যাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে পৌত্তলিকতা আরো অনেক বেশি ছিল. তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহদের আমারা ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী হিসেবে যতটুকু জানি ধর্মসংস্কারক হিসেবে কম জানি।

    বাই দ্যা বাই, হাজার বছরের বাংগালী সংস্কৃতির অংশ মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

  4. 7
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    প্রিয় পাঠক,
    বিনয়ের সহিত আপনাদের সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা, আমার বাংলা বানান & বাক্য গঠনে অনেক দুর্বল এবং ভুল থাকে। কষ্ট করে পাঠ করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  5. 6
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    @জিয়া ভাই,
    সদালাপের সকল ভাইদের মত সুন্দর করে লিখতে জানি না এবং পারিও না। সদালপের অনেক ভাই উচ্চ চিন্তার প্রকাশ করেন লিখার মাধ্যমে। বাস্তবতার নোংরামি যখন দেখি তা আমায় কষ্ট দেয়। রাজনীতিবিদ, উচ্চ পদস্থ সরকারী চাকুরীজীবী, পুলিশ…. এদের নোংরামি, দুর্নীতি প্রায়ই দেখি বিধায় কিছু লিখে ফেলি। চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

  6. 5
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    @শামস ভাই,
    আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আপনার সাথে সহমত। একই দৃশ্য দেশব্যপী। সহজ সরল মানুষদের জন্য খারাপ লাগে। তারা না বুঝে মাজার-কে দুনিয়ার পেরেশান থেকে মুক্তি & পরকালের মুক্তির পথ ও সমাধান মনে করে। এদের কেমন করে বুঝানো যায় এটা বিদাত এবং শির্ক? — চিন্তা করি কিন্তু সমাধান জানি না। কলিমা এবং ইসলামের বেসিক জ্ঞ্যান কিভাবে দেওয়া যায় — এর উত্তর আমার জানা না থাকলেও, আমার বিশ্বাস সদালপের অনেক ভাই চিন্তা করেছেন। যদি মতামত শেয়ার করা যায় তাহলে সুন্দর হয়।

  7. 4
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    আরেকটা পর্ব লেখেন -- পড়তে আগ্রহী।

  8. 3
    শামস

    লেখা অনেক গুছানো এবং রস মিলিয়ে দারুণ হয়েছে।

    জানি না ভালো মাজার আছে কিনা, যেখানে শির্ক হয় না. দেশে আমার বাসার পাশে বিল্ডিং এর অপরদিকে মাজার। একসময় ছোটকালে যেতামও, আর দশজনের মতো, বিষয়টা সামাজিক। ছোটকাল থেকেই দেখেছি তাদের। আপনি যা বর্ণনা করেছেন, সেখানেও অনেকটা একই চিত্র, তবে পরিস্থিতি একসময় ভয়াবহ পর্যায়ে রূপ নেয়. মসজিদের খাদেম এবং তার চৌদ্দগোষ্ঠী হয়ে যায় পীরের মতো. অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, মাদক সেবন অনেকটা প্রকাশ্য রূপ নেয়. এসব জেনেও মানুষ অন্ধের মতো এখানে দেন করতো সেটাই আশ্চর্যের! যদি ট্যাক্স বসাতো তাহলে সরকার মাসে কয়েক কোটি টাকা আয় করতে পারতো। টাকা পয়সার ভাগাভাগি নিয়ে রক্তারক্তি অবস্থায় চলে যাওয়ায়, কয়েকবছর আগে হঠাৎ দেখলাম সেখানে প্রশাসনের নোটিশ -- খাদেমদের ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ওরস করা সহ নানা বিধিনিষেধ। আল্লাহ অনেককে শির্ক থেকে হয়তো সাবধান হতে সাহায্য করলেন।

    শবে-বরাতে হাইকোর্ট মাজার, আটরশিসহ বেশ কিছু মাজারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। যদিও লেখা সেজদা দেয়া নিষেধ, অথচ এসব অহরহ ঘটছে. ট্যাক্সবিহীন এই লাভজনক ব্যবসা বন্ধ করা অনেক কঠিন। তবে মাজারগামীদের মূল অংশটা সমাজের দরিদ্র এবং অশিক্ষিত শ্ৰেণী, যদিও অনেক ব্যবসায়ীদের এসবে টাকা ঢালতে দেখেছি। আবার অনেকের কাছে পাপ টাপ করে কোন মাধ্যম দিয়ে আশু মুক্তির একটা উপায় এই মাজার। পাপ ছাড়া নাই, মাজারও ছাড়া নাই. মাজার হয়তো এদের পেপার বিপরীতে একধরণের মানসিক শান্তি। অবশ্য পাপও দীর্ঘস্থায়ী হয়!

  9. 2
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    চমৎকার লেখা হয়েছে। ভ্রমন কাহিনী না হয়ে একটা পর্যবেক্ষন হয়েছে।
    শাহজালালের মাজারে গিয়েছিলাম অনেক বছর আগে -- আপনার লেখা পড়ে মনে হলো তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। শিরক আর ভন্ডামীর একটা তীর্থস্থান। আল্লাহ সিলেটকে এই শিরক থেকে মুক্ত করুন।

    1. 2.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      @জিয়া ভাই, সালাম।

      ভ্রমনের আরো কিছু কথা ছিল, যোগ করিনি, লিখা বড় হয়ে যাচ্ছে বিধায়। ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।

  10. 1
    Mahfuz

    Admin Minister at The United States of America and Local Governments also permanently congress

Leave a Reply