«

»

Apr ০১

বিমান ভ্রমন আর আমাদের শাহজালাল বিমানবন্দর

বিয়ের পাত্রী দেখতে যাওয়ার আয়োজন। খালামনির বড় ছেলের জন্য সম্মন্ধ নিয়ে এসেছেন তার শ্বশুড়বাড়ির দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়। আমায় ফোন করে জানালেন পাত্রী দেখার অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। ফোনে তার কথাগুলো শুনতে খুব ভাল লাগছিল। খালামনি যখন আনন্দের সাথে হাসি দেন এবং কথা বলেন তখন তাকে মদীনার ভিতরে নিরবতার প্রশান্তির মত সুন্দর লাগে। এই গুনটি সচরাচর আর কারো মাঝে দেখি না। খালামনিকে বলি, এই অনুষ্ঠানে মুরুব্বীরা গেলে ভাল হয়, এটা মুরুব্বীদের কাজ। এখানে আমার যাওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া ছেলের মামা, চাচা, খালু, ফুফার সংখ্যা অনেক, তাদের বলা জরুরী। এদের না বললে, তাদের আত্মসম্মানবোধে লাগবে। আজকাল সবাই সবার আত্মসম্মানবোধ নিয়ে খুব বেশী সচেতন। সবার অর্থ-সম্পদের গাছ খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে বিধায় আত্মসম্মানবোধও সমাজে এখন এনাকোন্ডার মত ফুলে-ফেপে উঠছে। খালামনি বলেন, কে যাবে আর কে যাবে না- সেটা নিয়ে তোর মাতাব্বরি করতে হবে না। তোরে বলেছি, তুই শুক্রবার বিকেলে চলে আসবি, মাগরীবের পর রওনা হব, লাইন কেটে দিলেন। তার সুরে বুঝা গেল, সময়মত তার বাসায় উপস্থিত না হলে, তার মনের মদীনার প্রশান্তিতে আবার আগ্নেয়গিরির আগুন ধরতেও ১ সেকেন্ড সময় লাগবে না। মেয়ে মানুষের মন কখন কোন সময় পরিবর্তন হয়ে যায়, তা কারো সাধ্য নেই জানার। আর আমি তো একজন নাদান মানুষ।

বসে আছি পাত্রী বাড়ির বৈঠকখানার সোফায়। খালুজান পাত্রীর মামার সাথে গল্প পেতে মজে আছেন। মজাদার খাওয়া-দাওয়া শেষে চা পান। লিখা বড় হবে বিধায় বিস্তারিত না বলি। পাত্রীকে নিয়ে আসা হল। খালামনি কথা বললেন। পড়াশুনা, অতীত জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই-এক জন কথা বললেন। খালামনি আমায় চোখে ইশারা করলেন যেন কিছু জিজ্ঞেস করি। মনে মনে আশা করছিলাম আমায় যেন সুযোগ দেওয়া হয় কিছু বলার। মেয়ে-কে ২-টি প্রশ্ন করি। ১। ‘শান্তি’ জিনিষ-টা কি? ২। ধর, কোন অনুষ্ঠান বা পরিস্থিতির কারনে তুমি যদি এমন কোন খারাপ এবং ভয়ংকর মন-মানসিকতার মেয়ের সংস্পর্শে আস যে স্বাভাবিক আচরন করে না, তখন সেই পরিস্থিতি কেমন করে সামলাবে? কয়েকজন বিশেষকরে পাত্রীপক্ষ প্রশ্নগুলো পছন্দ করেলেন না। বাসায় আসার সময় খালামনি আমায় তিরস্কার করলেন, কেন আমি এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করলাম? বলি, আমি যা প্রশ্ন করেছি, বুঝে করেছি। আরো বললাম, এই মেয়ে আমার পছন্দ হয়নি, আর এই কথা বলা মাত্রই গাড়ির ভীতরেই আমার সাথে খালামনি চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিলেন। তার চিল্লাচিল্লি ধরনে মনে হল, তিনি এই পাত্রী আগেই সিলেকশান করেছেন। খালুজান ও মুরুব্বিরা খালামনিকে চুপ করতে বললেন। আমি কেন পছন্দ করিনি তার কারনও বলতে পারলাম না, খালামনির চেঁচামিচির কারনে বলার মুড হারিয়ে ফেললাম। মনে মনে বলি, আমি যদি কিছু নাই বলতে পারি তাহলে কেন এই কোরবানীর গরুর মত গলায় দড়ি দিয়ে বেধে নিয়ে আসা? অযথা কেন কষ্ট? আমি মেয়েকে পছন্দ করিনি তার কারন প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারার জন্য নয়, অন্য ২-টি কারনে। হাতের ও পায়ের আঙ্গুল একটি মেয়ের রুচির যথেষ্ট পরিচয় দেয়, পবিত্রতা ও সুন্দরতা প্রকাশ করে কিন্তু এটা ছিল অনুপস্থিত আর কথাবার্তায় লজ্জ্ব-শরম কম ছিল। “লজ্জ্বা” নারীর ভুষন। লজ্জ্বা না থাকলে সংসার হয় আগ্নেয়গিরি। ধৈর্য, নম্রতা, বুদ্ধি, ত্যাগ…… সবকিছুই লজ্জ্বাশীলতার উপর নির্ভরশীল। আর আমার পছন্দ না করার কারন খালামনিকে বললেও কোন ফায়দা নেই। তারা এই সব ইস্যু আমলে নিবেন না। যাই হোক, বিয়ে হয়েছে। মেয়ে পক্ষের টাকাওয়ালা হওয়ায় বিয়ে হল কিনা জানা নেই। অতীতে অনেক অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা দেখেছি। বিয়ে ভাল হলে, বলে- আল্লাহ্‌ করাইছে, আর খারাপ হলে যার মধ্যস্থতায় হয়, তার ১৪ গোষ্ঠীর খবর কইরা ছাড়ে। এখন শুধু এই বলেই গল্প শেষ করি, এই মেয়ে এখন খালামনির সংসারের গলার কাটা। মেয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী সাথে একসাথে থাকবে না। আর ছেলেও(আমার কাজিন) মেয়ের সাথে সংসার করতে এখন আগ্রহী নয়। ছেলে জানতে পেরেছে, মেয়ের অতীতে আরো কয়েকটি ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। বিয়ের আগে ভালভাবে আরো খোজখবর না নিলে এমন গলার কাটা হয়ে যন্ত্রনা দেওয়াই স্বাভাবিক। এখনকার মেয়েরা আলট্রা মডার্ন, অনেক স্মার্ট। টেকনিক্যালি কথা বললে, যে কোন মেয়ের অতীত সব বের করে ফেলা কোন ব্যাপার না, যতই স্মার্ট হোক। সকলের উচিত এইসব বিয়ের আগেই পরিস্কার করা যাতে বিয়ের পর ফাডাফাডি, মারদাঙ্গা কিলাকিলি, ঝগড়াঝাটি, কোর্ট-মামলা-মোকাদ্দমা না হয়।

প্রিয় পাঠক, উপরের এই বিয়ের অভিজ্ঞতা আমার এই লিখার বিষয়বস্তুর সাথে কোন সম্পর্ক নেই। গল্পটা অবতারন করেছি, আপনাদের মনযোগ আকর্ষন করার জন্য কারন বিয়ে একটি সেনসিটিভ এবং গুরুত্বপূর্ন ইস্যু। যে ইস্যু নিয়ে কথা বলব, তা হযরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ইহাই আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ন পোর্ট যার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সকল মানুষজন যাতায়ত করেন। দেশের অস্তিত্ব ও মর্যাদার অন্যতম দাবীদার। এই বিমানবন্দরের ওয়াশরুম/টয়লেট পাত্রীর হাত-পায়ের আঙ্গুলের মতই এই দেশ ও জাতির রুচির পরিচয় বহন করে। যারা বুঝবার তারা একটা নমুনাতেই বুঝে ফেলে, হাজার নমুনার দরকার হয় না। বিমানবন্দরের ভিতরের ওয়াশরুম/টয়লেট দেশের শাষনব্যবস্থা, আইনকানুন, মানুষদের নৈতিকতা, জীবনের মুল্যবোধের চিত্র ফুটিয়ে তুলে। নীচতলা, উপরের তলা পর্যবেক্ষন করলেই দেখা যাবে কমোড ভাঙ্গা, দরজায় লাগানো কাগজে লিখা “out of order”, ইউরিনালে পানি সাপ্লাই নেই, বেসিনে পানি পরতেছে- টেপকল নষ্ট, টয়লেট বা হেন্ড টিস্যু নেই, মেঝের টাইলস ভাঙ্গা…… এই আমাদের পরিচয়। যারা ওয়াশরুম/টয়লেট-র ভিতরের অবস্থা দেখে বুঝে ফেলে তারা বিমানবন্দরের বাহিরে বিচ্ছৃঙ্খলা আর গাড়ির অযথা হাইড্রলিক পে-পু হর্নে মন ক্ষুন্ন হন না।

বিমানবন্দরের ভিতরে যারা দায়িত্বরত- পুলিশ, কাস্টমস, সিকিউরিটি, অফিসার… তাদের অচরন এক রুক্ষতার সার্কাজম। দেশের যাত্রীরা যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাদের সাথে অনেকটা হেয় করে কথা বলে বিশেষ করে শ্রমিকদের সাথে। ভিতরে কর্তব্যরত মানুষগুলো তারা দেশের মানুষের প্রভু ভাব নিয়ে থাকে, সেবার জন্য নয়। আগে এদের আচরণে রাগান্বিত হতাম, এখন হই না, এখন এদের স্বভাবের বৈচিত্রের মজা নেই। যারা লাগেজ বিমান থেকে এনে বেল্টে রাখার কাজে নিয়োজিত, তারা চুরিতে খুবেই এক্সপার্ট এবং খানদানী চোর। মুহুর্তেই লাগেজ কেটে জিনিষ উধাও। কুয়ালালামপুর থেকে এলাম সাড়ে ৩ ঘন্টার কম সময়ে, আর লাগেজের জন্য বেল্টে বসে ছিলাম ৪ ঘন্টারও বেশী সময়। স্বর্ণ চোরাচালানে আমাদের বিমানবন্দর অন্যতম নিরাপদ একটি পথ হিসেবে ব্যবহার হয়, তারপরও প্রায়ই দৈনিকে দেখি অনেক কেজি স্বর্ণ ধরা পরতেছে। এই দেশে কোথায় দালাল নেই? কাষ্টমস-এ এত দালাল কেমনে হয়? যে কোন বিমান অবতারন করলে পরে, বাথরুমে কথা চলতে থাকে কাস্টমস ক্লিয়ার করার এবং বেশ কয়েকবার এই দৃশ্য দেখেছি। বিমানবন্দরের ভিতরে যা হয়, তা লিখে শেষ করা কঠিন।

ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে আছি, সামনে ১৫/১৬ জন। ৬৫ মিনিট লাগল অফিসারের ডেস্কে আসতে। এত লম্বা সময় আগে কখনও লাগেনি। ২/৩ মিনিট পাসপোর্ট নাড়াচাড়া করল। বুঝলাম, এই অফিসার আনাড়ি, নতুন জয়েন করছে। প্রশ্ন করলেন, কেন ঘন ঘন কুয়ালামপুর যাই? ব্যবসা করি কিনা? মনে মনে বলি, বেকুব না হইলে এই কথা বলতি না। ভিসা টাইপ মেনশন করা আছে। ভিতরে বিশ্রাম নিয়ে বিমান ছাড়ার ১৫ মিনিট আগে ফাইনাল সিকিউরিটি চেক-ইনে পৌছি। বিমানের সিট আমাদের দেশের বাস-ট্রেনের চেয়েও জঘন্য। এতই ঠাসাঠাসি যে, শরীর ব্যাথা করে। সবসময় সেন্ডেল, ট্রাউজার, পাতলা গেঞ্জি পরিধান করি। ফাইনাল চেক-ইনের অফিসার আমায় দেখে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলালেন। জীবনে মনে হয় এই রকম পোষাকে কোন যাত্রী দেখেন নি। আমার পায়ের সেন্ডেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমিও বলে দিই, জি আপনি যা ভাবছেন- তাই, সেন্ডেলের মুল্য ৪০ টাকা। অফিসার মুচকি হাসি দিলেন।

বিমানের ভিতরে ঢুকে বিজনেস ক্লাস পার হয়ে যখন একোনমি ক্লাসে গেলাম, তখন মনে হল কোন প্রাইমারী স্কুলে এসেছি। শিক্ষকবিহীন ক্লাসে ছেলে-মেয়েরা যেমন কথাতে ব্যস্ত, তেমনি ভিতরের পরিবেশ। এইরকম পরিবেশ আগেও অনেকবার পেয়েছি কিন্তু এবারের যন্ত্রনা সীমানা অতিক্রম। আর আজকের এই ফ্লাইটে কোন ফেমিলি নেই। সব শ্রমিক। বিমানবালারা ইকোনমি ক্লাসে যাচ্ছেন না, যখন যাত্রা শুরু হবে তখন যাবেন। এখন গিয়ে মাথা নষ্ট করতে চান না। আমি আমার সিটে গেলাম। এক ভদ্রলোককে বের হতে বললাম, আমি জানালার পাশের সিটে বসব। উনি বের হয়ে আমায় বসতে দিলেন কিন্তু জানালেন, এটা আরেকজনের সিট। উনি সামনে বা বাথরুমে গেছেন, এখনি ফিরে আসবেন। আমি বসতে বসতে বলি, এটা আমার সিট। অন্যজন কেন বসবেন? কিছুক্ষন পর এক ছেলে আসল মোবাইলে কথা বলতে বলতে, কাছে এসে আমায় বললেন, এই মিয়া উঠেন এইটা আমার সিট। বলেই আবার মোবাইলে কথা বলা শুরু করলেন। কথায় যথেষ্ট রুক্ষতা। পাশের লোকটি আমার দিকে তাকালেন। ছেলেটিকে বলি, আপনি আপনার বর্ডিং পাসটি দেখান। শুনেই, রুক্ষতা আরো বাড়িয়ে বললেন, এই সিট আমার। আপনি এখান থেকে উঠেন। বিমানবালা আমায় এই সিটে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। আহত এবং লজ্জ্বিত হই। আশপাশের সকল মানুষ এখন আমাদের কথা শুনছেন। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আপমানিত হচ্ছি। বিমানবালার কথা বলায় আমার আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগল। ৩ দিন পূর্বে নেটে আমার এই সিট 27A নিজে বুকিং দিলাম। বর্ডিং পাসেও লিখা 27A. এখন যদি ভুল হয়, তাহলে মান-ইজ্জ্বত নিয়া টানাটানি। আবার অনুরোধ করি, বর্ডিং পাসটি দেখানোর জন্য। ছেলেটি তখনও মোবাইলে কথা বলে যাচ্ছে সাথে আমার সাথেও কথা বলছে। হে, আমার বর্ডিং পাস না বের করা পর্যন্ত আপনার শান্তি হবে না, হুদাই কষ্ট দিতেছেন,মিয়া। কথাবার্তায় রুক্ষতা আরো বাড়ল। বর্ডিং পাস বের করে, আমার হাতে দিয়ে আবার মোবাইলে কথা বলায় ব্যস্ত। আশপাশের মানুষ এখনও কৌতুহল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষায় আছে, পরবর্তী ঘটনা কি ঘটে? খুব মজা পাচ্ছে। মানুষ-কে আপমানিত হতে দেখলে, সেটা তাদের মনে অনন্দের সৃষ্টি করে। বর্ডিং পাস দেখার পর, ইচ্ছা হল- রাস্তা ভাঙ্গার লোহার হাতুড়ী দিয়ে এই ছোকড়ার মাথার তালুতে একটা বসায়া দেই। মানুষজন তাকিয়ে আছে বিধায় এখন এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ব্যলেন্স করতে হবে। হাতুড়ী থাকলে একটা ভয় দেখানো যেত। বললাম, আপনার সিট 26E. সামনের সারির মাঝখানে। ঐযে ২ ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন, তাদের মাঝখানে। বর্ডিং পাস ফিরিয়ে দিতে দিতে বলি, জীবনে কি স্কুলে যান নাই? লেখাপড়া করেন নাই? নিজের বর্ডিং পাস যদি না পড়তে পারেন, তাহলে বিদেশ যান কেন? এবার আশেপাশের সকল লোকের দৃষ্টি এই ছোকড়ার দিকে। তখনও মোবাইলে কথা চলতেছে। সেই রুক্ষতা ধরে আবার আমায় রিপ্লাই দিল, ভুল তো মানুষেরই হয়। এত চেতেন কেন?

বিমান ছাড়ার সময় হয়ে এল। এনাউন্স করে সবাইকে মোবাইল অফ করতে বলল, কিন্তু কেউ তা করছে না। বিমান তার অবস্থান থেকে মুভ করা শুরু করল, পিছনে গিয়ে ঘোরা শুরু করল রানওয়ের উদ্দেশ্যে। পিছন সিট থেকে খুব জোরে আওয়াজ আসছে, হে আব্বা- বিমান ছাইড়া দিল, পৌছাইয়া ফোন দিমুনে। হ… হ… আচ্ছা ঠিক আছে। হয় হয়… আচ্ছা। বিমানবালা মোবাইল অফ করতে- বলতে বলতে ক্লান্ত। মোবাইলে এখনও অনেকের কথা চলছে। গরু-ছাগল তো মনে হয় এত অবাধ্য হয় না। বিমান রানওয়েতে যাচ্ছে, বিমানবালা লাইফ জেকেট, সিট বেল্ট বাধা নিয়ে নির্দেশ দিচ্ছে। এরই মধ্যে দুই-একজন সিট থেকে উঠে পরলেন, আরেক বিমানবালা এসে জিজ্ঞেস করলেন, উঠার কারন কি? বলে, টয়লেট। বিমানবালার মুখে ভাষা নেই, কি বলবে? কটমট করে তাকিয়ে আছেন। পাশের লোকগুলা বলতে লাগলেন, এই এখন বও, পরে যাইও।

পাশে বসা ভদ্র লোকের নাম মাহমুদ। কথা বলছি উনার সাথে। উনার জীবনের গল্প শুনছি। জানালেন, প্রায় ৬ বছর পর দেশে এসেছিলেন। ৪ মাস থেকে আবার যাচ্ছেন নতুন ভাবে। তার ৩ ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে ইন্টার পড়ছে, ছোট মেয়ে ক্লাস নাইনে। সবার ছোট ছেলে, বয়স ১০। এক রোড এক্সিডেন্টে ছেলের পা হারিয়েছে। ছেলে বেঁচে আছে। ছেলেকে দেখতেই এত দিন পর দেশে আসা। ৬ বছর পর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, মা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা। একমাত্র ছেলের পা হারানোর হৃদয় নিঙড়ানো কষ্ট আমায় না বললেও, একজন পিতা হিসেবে আমি অনুভব করি। জিজ্ঞেস করি, ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী পরিবার পরিজন রেখে বিদেশে এত লম্বা সময় অবস্থান করতে কেমন লাগে আপনার? শুনার পর এক দীর্ঘশ্বাস। কি বলবে, কি উত্তর দিবে- চিন্তা করছে। জানালেন তার কিছু কষ্টের কথা। আরো জানালেন, বেশী কষ্ট অনুভব করেন কুয়ালালামপুরে। বেতন-ভাতা, শরীরের কাজ করার ক্ষমতা, ভিসা-পাসপোর্ট, বৈধতা… সবকিছুতেই অস্থিরতা আর অশান্তি। আবার জিজ্জেস করি, একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে আপনার অধিকার কতটুকু পেয়েছেন নিজের দেশে? পেটের ধান্ধায় কেন আপনাকে বাহিরে আসতে হল? আবারো দীর্ঘশ্বাস। শুধু বললেন, রাজনীতিবেদরা অমানুষ। আর কিছু বললেন না। কিন্তু এই মাহমুদ সাহেবের মনের কথা পড়তে আমার আসুবিধা হয়নি। উনার অন্তর-বিবেক নীরবে ‘বিচার দিবস’-কে স্মরণ করেছেন। আল্লাহ্‌ একজন আছেন, উনি সব দেখছেন।

যখনই বিমানে জার্নি করি, বিমানবন্দরে বসে থাকি, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক ভাইদের জীবন কাহিনী শুনি। যাদের সাথে এই পর্যন্ত কথা বলেছি তাদের জীবন পাশে বসা মাহমুদ বা তার চেয়েও বেশী করুন ও কষ্টময়। রিয়াদে(সৌদি) যখন স্কুলে পড়তাম, দেশের মানুষের কষ্ট খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করতাম। ৪৪/৪৬ ডিগ্রী তাপমাত্রায় কাজ করা সহজ ব্যপার না। তারপর যখন কাজ করে মাস শেষে বেতন না পেতেন, তার অনুভূতি যে কেমন, তা আর কারো না হোক, তা বুঝার ও হৃদয়াঙ্গম করা বাংলাদেশের শাসক শ্রেনীর নেই। নীজের ক্ষুধা যত না সহ্য হয়, তার চেয়েও অনেক বেশী কষ্ট, নিজ পরিবারের ক্ষুধার সহ্য করা।

এর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে পৌছে যখন বিমান থেকে বের হলাম, বিমানের সকল যাত্রীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখলেন ইমিগ্রেশন পুলিশ। মনে হল, সবাই অপারাধী, জেল খানার কয়েদী। আমি ছাড়া বিমানের সকল যাত্রীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। এমন মানবেতর আচরণ কি কোন মুসলিম দেশ করতে পারে? এরা সবাই আন্তর্জাতিক যাত্রী তাদের সাথে কেন এই আচরন? এই পুলিশ দলে মহিলা পুলিশও ছিলেন হিজাব পরা। তারা অত্যান্ত রুঢ় এবং কঠোর ভাবে কথা বলতে থাকেন। আমি যাচ্ছি ইমিগ্রেশনের দিকে আর অন্তর কষ্টে আকড়ে ধরল। আমার দেশের মানুষদের সাথে দাসের মত আচরন করতেছে আমার সামনে। বিমানের এই যাত্রীদের পরিবর্তে দেশের সচিব-মন্ত্রীদের সাথে এইভাবে লাইনে দাঁড় করিয়ে এই আচরন করলে, দঃখ কিছুটা কমত। অন্ততঃ কিছু লজ্জ্বা-শরম যদি এদের ভিতরে পয়দা হয়। দেশের সম্মান-মর্যাদা বিক্রি বন্ধ হওয়া জরুরী। খুবই জরুরী।

৪ comments

Skip to comment form

  1. 4
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    ওয়ালাইকুম আসসালাম,

    চমৎকার। এক কথায় অনবদ্য। ভারী আলোচনা পড়তে গিয়ে যে পরিমান কষ্ট হয় -- তার ঠিক উল্টা আনন্দ পেয়েছি আপনার লেখাটা পড়ে। বিশেষ করে প্রথম ভাগ (অনেকটা এক টিকিটে দুই ছবি) দেখার মতোই হয়ে গেলো। বাংলাদেশে থাকার সময় কয়েকটা বিয়ের ঠুঁটো জগন্নাথ হওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। খুবই বিব্রতকর অবস্থা।

    আর বাংলাদেশে বিমানযাত্রী আর বিমানের ব্যবস্থাপনার যে চিত্র আপনি সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছে -- তা এক কথায় অনবদ্য। কিন্তু সমাধান কোথায়। যারা সমাধান করবে -- তার খুবই স্বার্থপর -- নিজেরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সকল সুযোগ সুবিধা নেয় আর সাধারন মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। আর দুর্নীতি তো সর্বনাশা।

    অনেক অনেক ধন্যবাদ আমার সকালটাকে সুন্দর করার জন্যে। আরো লিখুন। ভাল থাকবেন। আল্লাহ আপনার জন্যে রহমত দান করুন।

  2. 3
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    সম্পাদক সাহেব,
    অনুরোধ জানাচ্ছি category-তে “ভ্রমন” অপশনটি এড করার জন্য। ধন্যবাদ।

    এড করা হয়েছে (সাহিত্যের আন্ডারে)। ধন্যবাদ। -- সম্পাদক, সদালাপ।

  3. 2
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    জিয়া ভাই, আসসালামু আলাইকুম।
    লিখাটি আপনার জন্য। আপনি আমার লিখা পড়তে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিধায় লিখলাম। আর লিখার ধরন দেখে বুঝতেই পারছেন, আমি লিখার মান ভাল নয়, ভাব প্রকাশ করতেও পারি না। হয়ত আর লিখা হবে না। ভাল থাকুন।
    🙂

  4. 1

    fine

Leave a Reply