«

»

নভে. ০৬

একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে “দ্বীন” এর ব্যাখ্যা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

"আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আল আমিন। আর রাহমানির রাহীম মালিকী ইয়াওমিদ্বীন… … … … …" (সুরা আল-ফাতেহা)

আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। সুরা আল ফাতেহা হচ্ছে উম্মুল কুরআন বা কুরআনের মা। সুরা আল ফাতেহার মাঝে হযরত আদম (অঃ) থেকে শুরু করে সমস্ত মুমিন বান্দার মনের চাহিদা বা আকাঙ্খা প্রকাশিত হয়েছে আর আল্লাহ তায়ালা বান্দার মনের চাহিদা বা আকাঙ্খাকে পূরণ করতে কুরআনের অবশিষ্ট আয়াতগুলিকে নাযিল করেছেন। সুরা আল ফাতেহা একটি দু'আ যা আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। এ দু'আর মাধ্যমে বান্দা নিজের জন্য আল্লাহর নিকট থেকে "দ্বীন" চেয়ে নেয় বা প্রার্থনা করে। আল্লাহ তায়ালা বান্দার প্রার্থনার জবাবে বান্দাকে "দ্বীন" প্রদান করলেন। "দ্বীন" কি? মানুষের জন্য দ্বীন হচ্ছে আল কুরআন। দ্বীন কথার সহজ অর্থ বৈশিষ্ট্য। মানুষের বৈশিষ্ট্য বা গুণ কেমন হবে আল্লাহ তায়ালা আল কুরাআনে তা বর্ণনা করে দিয়েছেন। তাই মানুষের জন্য দ্বীন হচ্ছে আল কুরআন।

সমস্ত সৃষ্ট বস্তুকে আল্লাহ তায়ালা তাদের নিজ নিজ দ্বীন বা বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর দ্বীন তাদের সথে যুক্ত করে দেয়া আছে। তারা নিজ নিজ দ্বীনের ব্যতিক্রম করতে পারে না। পানির দ্বীন বা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিচের দিকে গড়ানো। পানি উপরের দিকে গড়াতে পারে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে এটাই তার জন্য দ্বীন। পানিকে তাপ দিলে বাষ্প হয় ঠান্ডা করলে বরফ হয়। পানি তার জন্য নির্ধারিত দ্বীনের ব্যতিক্রম করতে পারে না। পানিকে তাপ দিলে বরফ আর ঠান্ডা করলে বাষ্প হবে না। আবার পশু মাঠের ঘাসও খায়, ক্ষেতের ফসলও খায়। ক্ষেতের ফসল নষ্ট করাতে কার ক্ষতি হলো পশু তা বুঝবে না, বুঝতে চাইবেও না। অন্যের ক্ষেতের ফসল নষ্ট করাতে পশুর জন্য কোনো গুনাহ নাই কারণ এটাই তার বৈশিষ্ট্য বা তার জন্য আল্লাহর নির্ধারিত দ্বীন। তাই পশুপাখি সহ সকল সৃষ্ট বস্তুর দ্বীন তাদের অস্তিত্বের সাথে যুক্ত করে দেয়া আছে। তারা নিজ নিজ দ্বীনের ব্যতিক্রম করতে পারে না। শুধুমাত্র সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল দ্বীন ছাড়া অবস্থায়। দ্বীন হারনোর ফলেই হযরত আদম (আঃ) পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। দ্বীন হারিয়েই তিনি শত শত বছর কেঁদেছিলেন।

হযরত আদম আঃ জান্নাতে থাকা অবস্থায় শয়তানের কুমন্ত্রণায় নিজের দ্বীন নষ্ট করেছিলেন। জান্নাতে হযরত আদম (আ:) ও তাঁর সঙ্গী হাওয়া (আ:) এর জন্য যা-ইচ্ছা তা-ই করা হালাল ছিল শুধু একটি নির্ধারিত বৃক্ষের নিকটে যাওয়া নিষেধ ছিল। পানির জন্য যেমন নিচের দিকে গড়ানো অনুমতি আছে কিন্তু উপরের দিকে গড়ানো নিষেধ আছে। একইভাবে হযরত আদম আঃ এর জন্য সবকিছু করার অনুমতি ছিল কিন্তু নির্ধারিত একটি বৃক্ষের নিকটে যাওয়াও নিষেধ ছিল। এভাবে আল্লাহ তায়ালার অনুমতি এবং নিষেধাজ্ঞা এ দু'য়ে মিলে জান্নাতে হযরত আদম আঃ এর জন্য একটি "দ্বীন" ছিল। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় আদম আঃ যখন তাঁর জন্য আল্লার নির্ধারিত দ্বীন নষ্ট করলেন তখন তিনি দ্বীনহারা অবস্থায় পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হলেন। এজন্যই আমরা দেখতে পাই দুনিয়াতে সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর "দ্বীন" তাদের অস্তিত্বের সাথেই যুক্ত আছে কিন্তু মানুষের "দ্বীন" তাদের অস্তিত্বের সাথে যুক্ত অবস্থায় নেই। যদি মানুষের দ্বীন আল্লাহ তায়ালা মানুষের অস্তিত্বের সাথে যুক্ত করে দিতেন তবে, আল্লাহর কসম, কোনো মানুষ চুরি করতে পারত না। খুন, রাহাজানি, হত্যা, ধর্ষণ করতে পারত না। মানুষ সুদ-ঘুষ গ্রহণ করতে পারত না। কারণ ঐসব কাজ মানুষের দ্বীন বা বৈশিষ্ট্য নয়। ঐসব হচ্ছে খান্নাস-শয়তান-অমানুষের দ্বীন। দুনিয়াতে মানুষের দ্বীন মানুষের অস্তিত্বের সাথে আল্লাহ তায়ালা যুক্ত করে দেন নাই। কারণ জান্নাতে শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ দ্বারা হযরত আদম (আঃ) ভুলবশতঃ নিজের দ্বীন নষ্ট করেছিলেন। এবং এর দ্বারা নিজের ইচ্ছামত চলার আকাঙ্খা প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা আদম আঃ এর স্বাধীন ইচ্ছামত চলার এই আকাঙ্খাকে পূরণের জন্য দুনিয়াতে নিক্ষিপ্ত করলেন দ্বীনহারা অবস্থায় নিজের ইচ্ছামত চলার জন্য। হযরত আদম আঃ তাঁর ভুল বুঝতে পেরে শত শত বছর কাঁদলেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝতে পারলেন যে, সৃষ্ট বস্তু কখনও দ্বীনহারা অবস্থায় চলতে পারে না। সৃষ্ট বস্তু নিজের ইচ্ছামত চলতে গেলে হালাকির পথে চলে যাবে। ধ্বংস এবং গজবের পথে চলে যাবে। সৃষ্ট বস্তুর জন্য কোন কাজ/জিনিস ভাল কোনটি মন্দ সে ব্যাপারে তার সৃষ্টিকর্তা মালিক মহান স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাঁর মহান স্রষ্টা বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহ তায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন আর নিজের জন্য আল্লাহর নিকট একটি "দ্বীন" ভিক্ষা চাইতে থাকলেন। তিনি তো এরকমই বলতে চাইলেন যে, হে আমার আল্লাহ! আমার মালিক! আমি জানিনা আমার জন্য কোন্ কাজ ভাল আর কোন্ কাজ মন্দ। আপনি আমার স্রষ্টা। আপনিই ভাল জানেন আমার জন্য কোন্ কাজ ভাল কোন্ কাজ মন্দ। তাই আপনি আমাকে আমার করণীয় ও অ-করণীয় বিষয় নির্ধারণ করে দিন। কোন কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্য পালন করলে আমার জন্য মঙ্গল হবে তা বলে দিন। আপনার পক্ষ থেকে আমাকে আদেশ ও নিষেধ সহ একটি দ্বীন প্রদান করুন যাতে আমি হেদায়াত পেতে পারি ও আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। যাতে আমি স্বাধীন ইচ্ছায় চলা থেকে বাঁচতে পারি। হালাকি, ধ্বংস ও গজবের পথ থেকে বাঁচতে পারি।

আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম আঃ কে পৃথিবীতে দ্বীনহারা অবস্থায় পাঠিয়েছিলেন স্বাধীন ইচ্ছা চর্চা করার ক্ষতি কেমন তা বুঝাবার জন্য। আর আদম (আঃ) ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইবার পর মহান করুনাময় আল্লাহ তায়ালা প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তিনি পৃথিবীতে দ্বীনহারা বান্দার জন্য দ্বীন প্রেরণ করবেন নবী ও রাসুলের মাধ্যমে এবং যাদের ইচ্ছা হয় তারা যেন তা গ্রহণ করে নিজ নিজ কল্যাণের পক্ষে। এজন্যই দুনিয়াতে মানুষের দ্বীন মানুষের সাথে যুক্ত অবস্থায় নেই। দ্বীন গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাধীন করে পাঠিয়েছেন। মানুষের অস্তিত্বের সাথে মানুষের দ্বীনকে তিনি শর্ত হিসেবে জুড়ে দেন নাই।

তাই এই মহান সুরা ফাতেহা হচ্ছে সেই হৃদয় নিংড়ানো সুরা যার মাধ্যমে দ্বীনহারা বান্দা তার মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের নিকট দ্বীন ভিক্ষা চেয়ে আবেদন করে। আর সেই আবেদনের জবাবে দয়াময় আল্লাহর রহমত ও করুণা মানষের উপর কুরআনের এক একটি আয়াত হয়ে ঝরে পড়ে রহমাতুল্লিল আল আমিন রাসুল (সাঃ) এর মাধ্যমে।

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন স্বাধীন ইচ্ছার ক্ষমতা দিয়ে আর মানুষের জন্য নির্ধারিত দ্বীন পাঠিয়েছেন নবীয়ে পাক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে। যার ইচ্ছা হয় সে এই দ্বীন গ্রহণ করুক এবং কল্যাণ লাভ করুক। যার ইচ্ছা হয় সে নিজের কল্যাণের পক্ষে কুরআনের বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করুক। কারণ মানুষের সামনে রয়েছে ইয়াওমুদ্বীন বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশের দিন- যাকে বলা হয় বিচার দিবস বা হাশর। সেটা হবে এমন এক দিন যে দিনে মানুষের বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশ হয়ে পড়বে।

"তোমরা মৃত্যু থেকে যতই পলায়ন কর মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাত হবেই। অতঃপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে আল্লাহর নিকট। তখন তিনি প্রকাশ করে দেবেন তোমরা যাকিছু করতে।" (সুরা জুমআ, আয়াত-০৮)

ঐদিন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ঐ দিনটি হবে এমন এক দিন যে দিনে মানুষের সব কৃতকর্ম আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ করে দেবেন। প্রত্যেক মানুষের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে দেবেন। যেহেতু মানুষের আমলের দ্বারা মানুষের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় তাই ঐদিন হবে প্রত্যেক মানুষের বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ার দিন। তাই ঐ দিনকে কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে বৈশিষ্ট্য প্রকাশের দিন বা ইয়াওমুদ্বীন। তারপর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কার স্থান কোথায় হবে তা আর বলে দিতে হবে না। সেদিনে যারা আসামী হবে তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে যে বিচারে তার কি রায় হওয়া উচিত। তাই কুরআনের ভাষায় ঐ দিনকে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন "বৈশিষ্ট্য প্রকাশের দিন"- ইয়াওমুদ্দিন। ঐদিনে মানুষ আল্লাহর হুকুমে নিজ নিজ স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যের ভালমন্দ সম্পর্কে জেনে যাবে এবং নিজের বিচারের রায় নিজের কাছেই ধরা পড়বে।

অতএব প্রিয় ভাইয়েরা আমার! পানির বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম পানির সাথেই আছে। পশুর ধর্ম পশুর সাথেই আছে। কিন্তু মানুষের ধর্ম মানুষের সাথে নাই। সে কারণেই মানুষ একেক জন একেক রকম ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। কেউ চুরি করে, কেউ করে না। কেউ সুদ-ঘুষ নেয়, অনেকে নেয় না। কেউ খুন করে, কেউ আবার অপরের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়। একই জাতের মানুষ বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী অথবা বস্তু এতসব বিপরীত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না। সকল বস্তু ও প্রাণী নির্ধারিত ধর্ম বা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। অন্যদিকে, সৃষ্টির সেরা জীব একমাত্র মানুষকেই দেখা যায় বহুবিচিত্র প্র্রবল বৈপরীত্যমূলক আচরণ করতে। ফলে পৃথিবীর মানুষকে নিজের বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম অর্জন করে নিতে হয়। আর উত্তম দ্বীন বা বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম হচ্ছে আল-কুরআনের ধর্ম। যে এই দ্বীন গ্রহণ করবে সে সফলকাম হবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উত্তম বৈশিষ্ট্যসমুহ প্রদান করুন। এবং আমদের জন্য তিনি উত্তম অবস্থা নাযিল করুন। তিনিই সকল কিছুর মালিক, তিনি সর্বক্ষমতাবান। আমীন।

৩ মন্তব্য

  1. মাহফুজ

    //মানুষের জন্য দ্বীন হচ্ছে আল কুরআন// – ১০০% খাঁটি কথা।

    কিন্তু ভাইজান, হাদিছের কথা কিছু কইলেন না যে!? আপনার এই বক্তব্যের কারণে কিন্তু ভবিষ্যতে আপনাকে ”আল-কুরানী” হিসেবে আখ্যা ও ব্যাখ্যা দেওয়া হইতে পারে!

  2. মহাজাগতিক

    মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আপনি ঠিকই বলেছেন ধর্ম খুবই সেনসেটিভ বিষয়। এখানে কিছু কথা উহ্য থাকলে তা বোঝার চেষ্টা অনেকেই করে না বরং ল্যাঠা বাধানোর চেষ্টা করে। ব্যাপার হলো কুরআনের বাস্তব রূপই হলো রাসুলের জীবন। আবার হাদীস হলো রাসুলের জীবনের কাজ, কথা ও সম্মতি। সুতরাং কুরআন মানতে গেলে যে হাদীস ছাড়া হবেনা সেকথা তো বলার দরকার হয় না।

  3. shahriar

    thanks

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।