«

»

ডিসে. ১৯

এ যুগের সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট

ভুমিকা:
গত শুক্রবার ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের মসজিদে জুম্মার খতীব ছিলেন নর্থ আমেরিকার ইসলামি স্কলারদের অন্যতম, সমাদৃত, একজন আলেম ড: আব্দুল্লাহ হাকিম কুইক । খুতবার বিষয় বস্তু ছিল, "The Crisis in Aleppo: Reflections & Resolutions" "আলেপ্পো সঙ্কট  : ভাবনা ও সমাধান"।  সে  প্রেক্ষিতেই আজকের এ লিখা।

আলেপ্পোতে" কি হচ্ছে? যারা আন্তর্জাতিক খবর পড়েন তারা জানেন সিরিয়ার "আলেপ্পোতে" কি হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে যে বিশেষ আলোচনার প্রয়োজন আছে তা সবাই স্বীকার করবেন। প্রথমেই   কয়েক সেকেন্ডের নিচের দুটি ভিডিও শুনা দরকার।

 

সিরিয়ার সঙ্কটকে এ যুগের সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট বলে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘ। গত কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটিতে চলছে অবর্ণনীয় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ !  সব মিলিয়ে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই এই যুদ্ধের কারণে বাস্তুহারা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা তাদের সর্বশেষ এক রিপোর্টে বলছে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে সেদেশ থেকে তিরিশ লাখের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। অন্যদিকে সিরিয়ার ভেতরেই ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে আরও প্রায় ৬৫ লক্ষ মানুষ।" এক বছরেরও কম সময়ে দশ লক্ষের বেশি সিরীয়ান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এই শরণার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে না আসায় এই রিপোর্টে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সমালোচনা করা হয়েছে।

সিরিয়ার আলেপ্পোর বর্তমান অবস্থাকে নরকের সমার্থক মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তিনি বলেন, ‘আলেপ্পো এখন নরকেরই সমার্থক। আমরা সিরিয়ার পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছি।’ আলেপ্পোতে অবিরাম চলছে গোলাগুলি। ধূলোয় মিশে গিয়েছে গোটা শহর। সরকার-বিদ্রোহী সংঘর্ষে এখনও রক্তাক্ত সিরীয় শহর আলেপ্পো।

প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পাশাপাশি সিরিয়ার পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও ইরানের মদদ দেয়া নিয়ে সরব হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। তবে আলেপ্পো এখনও সেই তিমিরেই। (সূত্র: বিবিসি ও আরটিএনএন)

মঙ্গলবার ( ১৩ ডিসেম্বর) জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তরের মুখপাত্র রুপার্ট কোলভিল জানান, সিরিয়ার সরকার সমর্থিত বাহিনী পূর্ব আলেপ্পোতে প্রবেশ করেছে এবং শহরের ভেতরে যারা রয়েছে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে ১১ জন নারী ও ১৩ শিশু রয়েছে। তিনি জানান, জাতিসংঘের কাছে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে পূর্ব আলেপ্পোর চারটি এলাকায় ৮২ জন বেসামরিক নাগরিককে ঘটনাস্থলেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি একেবারেই বিপর্যস্ত।

চার বছর ধরে আলেপ্পোর পূর্ব অংশ দখলে রেখেছিল বিদ্রোহীরা। কিন্তু গত সপ্তাহে শহরের একটি বড় অংশের পতন ঘটে সরকারি বাহিনীর হাতে। বিদ্রোহীরা এখনো পূর্ব আলেপ্পোর কিছু অংশ দখল করে রেখেছে। তবে এর পতন কেবল সময়ের ব্যাপার। বিদ্রোহীদের দখলকৃত এ অংশে আটকা পড়ে আছে কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিক। এখানে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্র রাশিয়া টানা বোমা বর্ষণ করে চলছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রেডক্রস এ বোমা হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।

মানবতার এত বড় অবমাননা এত অধিক সংখ্যক মানুষের হত্যা, বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল রাস্তাঘাট সহ বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংস, এ ভীষণ করুন অবস্থা আধুনিক বিশ্বে কিভাবে যে হতে পারে তা কল্পনা করতেও অবাক লাগে, শরীর শিওরে উঠে অথচ এটাই বাস্তবে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সেই অঞ্চলে। মানবতার এ চরম বিপর্যয়, এত   মৃত্যু এত ধ্বংস এসব কিছুই যেন বিশ্ব বিবেকের কাছে কোন আশাব্যঞ্জক সাড়া জাগাতে পারছেনা! বিশেষকরে সিরিয়ার এ সঙ্কট নিরসনে  বিশ্ব মোড়লদের ভূমিকা দেখলে ধিক্কার দিতে মনে হয়।  এ সমস্যার আদৌ কোন সমাধান হবে কি না বলা কঠিন।  তাই  বিপর্যস্ত মানবধিকার দেখে লিখতে বসলাম। তবে এই হতাশার মাঝে এ খুতবাটি  এক জন বিশ্বাসীর মনের দু:খ কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে আশা করা যায়। শেখ আব্দুল্লাহ হাকিম যথার্থই বলেছেন সিরিয়ায় আজ যা হচ্ছে তা কোন বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয় বরং এসব হচ্ছেও মুসলিম দেশে চলমান হামলার অংশ। অতীতেও  আমরা দেখেছি মুসলিম জনপদে যেমন বসনিয়া, ফিলিস্তিন ও কাশ্মীর, ইরাক, ইয়েমেন, আফগানিস্তান ও বার্মায় কিভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং এখনও কোথায় না কোথায় আজও ঘটছে তবে সিরিয়ার মত এত নৃশংস অত্যাচারের দৃশ্য এত স্পষ্ট আকারে কখনও প্রকাশিত হয়নি যা আজ আমরা তথ্য প্রযুক্তির কারণে দেখতে পাচ্ছি। তবে একজন মুসলিম হিসাবে এসব ফিতনাকে কীভাবে দেখতে হবে বা মূল্যায়ন করতে হবে ইসলামিক ইতিহাস ও কোরআন হাদিসের আলোকে এবং  এর সমাধানে কি করতে হবে সেটাই ছিল তাঁর খুতবার মূল বক্তব্য। ওনি একটি হাদিসের রেফারেন্সে কথাগুলা রেখেছেন। দীর্ঘ হাদিস এখানে দেখতে পারেন। তবে এটা বলা যায় বিশ্বে মুসলিম জনপদে যা হচ্ছে এসব কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন না। আগে পিছের ঘটনার সাথে সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক আছে বিশ্ব মোড়লদের তেল গ্যাস ও মুনাফা লাভের স্বার্থ আর সম্পর্ক-যে আছে তা সবাই বুঝতে পারে না। আলোচ্য এ হাদিসে রাসুল (স:) একটি কথা বলেছেন, "I am afraid about my community of those leaders who will lead astray" – "আমার ভয়  হচ্ছে আমার উম্মতের মাঝের সেই সব নেতৃত্বের যারা ভুল পথে নিয়ে যাবে…"  আজ সেটাই হচ্ছে এ ধরণের নেতারাই মুসলিম দেশের ক্ষমতায় আছে যাদের কারণেই এত বিপর্যয়!

পুরা খুতবাটি শুনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন। Friday Sermon (12-16-2016) Shaikh Abdullah Hakim Quick – The Crisis in Aleppo: Reflections & Resolutions

 

সিরিয়ার ব্যাপারে আমার পূর্বপ্রকাশিত দুটি লিখা:
১) এ কি সেই আখেরী জামানার আলামত?
২) সিরিয়ার বিপ্লব বদলে দিতে পারে মুসলিম বিশ্ব

১ মন্তব্য

  1. মহিউদ্দিন

    একটি বিষয় এতদিনে প্রমাণিত হয়েছে অনেকেরই কাছে যে ওবামা বিশ্বে মানবিধিকার, গনতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেকচার দিতে যত ভাল সে তুলনায় বাস্তবে তা রুপায়ণ দিতে তত বেশী ব্যর্থ। আর সে শুন্য স্থান পুরনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সফলভাবে কাজে লাগাতে ছুটে গিয়েছেন। তার অন্যতম উদাহরণ সিরিয়ায় রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক সফলতা।

    গত পাঁচ বছরে সিরিয়ার গৃহ যুদ্ধে পাঁচ লক্ষের অধিক সংখ্যক বেসামরিক লোকের মৃত্যু এবং লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের কি নিদারুন কষ্ট ও যন্ত্রনা আর সিরিয়ার জনগণের গভীরতম হতাশার গভীরতার অভিজ্ঞতা পরেও যে গণতান্ত্রিক সিরিয়ার স্বপ্ন সিরিয়ার জনগণের ছিল সে প্রত্যাশা পুরণের সম্ভাবনা মনে হচ্ছে অনেক দূরে ।

    https://www.theguardian.com/world/2016/dec/29/russia-calling-shots-middle-east-syria

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।