«

»

Sep ২৬

বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত আমাদের এই পৃথিবী- উদ্দেশ্যহীন নয়তো! – ৫

পৃথিবীর সৃষ্টি প্রক্রিয়া ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে শুরু হলেও আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন শিলার বয়স আনুমানিক ৩.৫ বিলিয়ন বছর। কিন্তু সে-সময়ে পৃথিবীর কোনো স্হির ভূত্বক ছিল না। এ-সময় ভূ-ভাগ ও এর অভ্যন্তরে খুব অস্হির অবস্হা বিরাজ করত। অনেক সময় ধরে চলা বিভিন্ন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এর পর অবশেষে একটি স্হির ভূত্বককে (crust) আমরা পাই যা বসবাসের জন্য উপযোগী। এই ভূত্বক আনুমানিক ৮ থেকে ৪০ মাইল পর্যন্ত গভীর হয়ে থাকে। এই অংশটি খুব মজবুত ও ঠান্ডা হয়ে থাকে। আর এর ঠিক নীচেই থাকে ‘ম্যান্টল’ যা প্রায় ১৮০০ মাইল পর্যন্ত গভীর হয়ে থাকে। এই ‘ম্যান্টল’ খুব ধীরে বইতে পারে। পৃথবীর ভূ-ত্বকও ঐ ‘ম্যান্টল’ এর উপর ভাসছে। বহমান এই ‘ম্যান্টল’ ভূ-ত্বককে বড় বড় পাথরখন্ডে (slab) ভেঙ্গে ফেলে যাকে টেকটোনিক প্লেট বলে। আর এই প্লেটগুলোই মহাদেশ গঠনের জন্য দায়ী।

‘ম্যান্টল’ এর একেবারে উপরের অংশটিকেও ভূ-ত্বকের অংশ ধরা হয় যা ‘লিথোস্পিয়ার’ নামেও পরিচিত। অপরদিকে ‘লিথোস্পিয়ার’ এর অপেক্ষাকৃত নীচের অংশটি যাকে ‘এসথেনোস্পিয়ার’ নামে পরিচিত তা তুলনামূলকভাবে উত্তপ্ত। ‘লিথোস্পিয়ার’ ও ‘এসথেনোস্পিয়ার’ স্তরের মধ্যে তাপের আদান-প্রদান ‘সমতাপী’ বা ‘রূদ্ধতাপীয়’ নামে পরিচিত। এর দ্বারা পৃথিবীর ভূ-ত্বকের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তাছাড়া পৃথিবীর ভিতরের উত্তপ্ত কোরের তরল আয়ন (চার্জ) চুম্বকত্বের জন্য দায়ী। আর এই চুম্বকত্বের জন্যই পৃথিবী প্রলয়ন্করী ‘সৌরঝড়ের’ প্রভাব থেকে প্রায় মুক্ত থাকে। অথচ আমাদের নিকট প্রতিবেশী গ্রহ যেমন মঙ্গল সূর্য থেকে আমাদের থেকে দূরে থাকা সত্ত্বেও, চৌম্বকত্ব খুব কম থাকায় এটিকে সৌরঝড়ের ধকল পোহাতে হয়। কোনো কারণে পৃথিবীর চৌম্বকত্ব যদি কমে যায় তবে তা কেবল মঙ্গলের মতই একটা মৃত গ্রহে পরিণত হতে পারে।

অ্যাপোলো ও অন্যান্য কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবিতে পৃথিবীর চারপাশে একটি সুন্দর নীলাভ আবরণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মুগ্ধ করা এই দৃশ্য শিল্পীর আঁকা তুলির ছোয়াকেও যেন হার মানায়। এই নীলাভ আবরণটি আর কিছু নয়, পৃথিবীতে জটিল প্রাণীদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় বায়ুমন্ডল। এই বায়ুমন্ডল পৃথিবীর মোট ব্যাসের মাত্র ১ ভাগ। এটা মূলত ২১ ভাগ অক্সিজেন, ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন ও ১ ভাগ কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সংমিশ্রণ। পৃথিবীর এই বায়ুমন্ডল প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উপর পর্যন্ত বিস্তৃত। আর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার উপরে উঠলেই শ্বাস নেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে। তাছাড়া এই আবরণই পৃথিবীকে রক্ষা করে সূর্যের ক্ষতিকর উপাদান থেকে, বিশেষত ট্রপোস্ফিয়ার এর ওজোন স্তর। এই ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মিকে শোষণ করে ও পৃথিবীতে আসার পথ রুদ্ধ করে দেয়। তাছাড়া এই বায়ুমন্ডল পানিচক্রে বিশেষ অবদান রাখে আর নিশ্চিত করে উপযোগী পানির সরবরাহ।

ধরুন সূর্য হঠাৎ করে তাপ বিকিরণ বন্ধ করে দিল! ভাবুন কেমন হতে পারে এই পৃথিবীর অবস্হা! হ্যা, শুরু হয়ে যাবে জটিল প্রাণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের সরবরাহে ঘাটতি পড়া। কারণ পৃথিবীর খাদ্যগুদাম গাছপালার সালোক-সংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তারা মারা পরতে থাকবে খুবই দ্রুতহারে। অবশ্য অতিধীরে ঘটা বিপাকক্রিয়া ছাড়াও চিনির পর্যাপ্ত সংগ্রহের জন্য বড় গাছেরা হয়ত অনেকদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মহাকাশবিজ্ঞানের প্রফেসর ডেভিড স্টিভেনসন এর মতে, এক সপ্তাহের মধ্যেই পৃথিবীর তাপমাত্রা শুন্য ডিগ্রি ফারেনহাইটের নীচে নেমে যাবে, ধীরে ধীরে গিয়ে ঠেকবে আনুমানিক -১০০ ডিগ্রিতে। সমুদ্রের উপরের স্তরটি বরফ হলেও নীচস্তরের পানি কয়েক হাজার বছর ধরে বিরাজ করবে। হয়ত মিলিয়ন বছর পরে পৃথিবীর তাপমাত্রা -৪০০ ডিগ্রিতে স্হির হবে। এই অবস্হায়ও হয়ত কিছু ক্ষুদ্র অনুজীব বেঁচে থাকতে পারে।

একথা ভুলে গেলে চলবে না যে সূর্য যে কেবল আমাদের আলো আর তাপ দিয়েই ক্ষান্ত হয় তা না, পৃথিবীকে তার কক্ষপথে রাখতেও সাহায্য করে। প্রশ্ন আসতে পারে, সূর্যের মতই আরো অনেক নক্ষত্র আছে যেগুলো অনেক গ্রহের জন্যই একই ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে সূর্য এমন কি বিশেষত্বের দাবী করে! গবেষণা করে দেখা গেছে, শুধু সূর্যের মত নক্ষত্র থাকলেই হবে না, এর আয়াতনটিরও একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। আমাদের বর্তমান সূর্যের আয়াতন যদি ছোট হয়, ধরা যাক মূল আয়াতনের ৯০ ভাগ হয়, বাসস্হানের উপযোগী এলাকা বা সোলার হেবিটেবল জোন (আগের অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে) হয়ে পড়বে ছোট, আর পৃথিবীও হয়ে পড়বে সূর্যের খুব নিকটবর্তী। আর তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াস্বরূপ ঠান্ডা ও উষ্ণতার তারতম্য হবে খুব বেশী এবং জটিল প্রাণী থাকার জন্য এটা হয়ে পড়বে অনুপযোগী।

অতএব দেখা যায় আমাদের পৃথিবীর মত ‘আরেকটি পৃথিবী’কে পাওয়াটা বিরাট প্রশ্নবোধক! এই পর্ব ও আগের পর্বে উল্লেখিত কিছু ফ্যাক্ট এর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, যেকোন একটি বিশেষত্বের ঘাটতি ও একটু হেরফের গ্রহকে জটিল প্রাণের অনুপযোগী করে ফেলতে পারে অতি সহজেই। বিজ্ঞানীরা একটি সম্ভাব্যতার হিসাব কষেছেন, দেখেছেন জটিল প্রাণের জন্য এইসব অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলোকে হিসাবে নিলে (তারা মাত্র ১৫টির মত ফ্যাক্টরকে হিসাবে নিয়েছেন) এবং তাদের প্রতিটির জন্য সম্ভাবনাকে ১০ ভাগের ১ ভাগ করে নেয়া হলে, ‘আরেকটি পৃথিবী’র সম্ভাবনা ১/১০০০০০০০০০০০০০০০ ভাগ। খুবই ক্ষুদ্র হলেও এই সাংখ্যিক মানকে তারা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কারণ ভুলে গেলে চলবে না হাজার হাজার বিলিয়ন নক্ষত্র ও গ্রহের কথা। অবশ্য এই মান এ পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্ত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে। ভবিষ্যতে একে আরো ক্ষুদ্র হিসাবে পেলে অবাক হবার কিছু থাকবে না! তবে যে জিনিষটি সামনে চলে আসে তা হল আমাদের পৃথিবীর স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্ব, এক কথায় অসম্ভবরকম বিরল ও অসাধারণ! (আগামী পর্বে…শেষ!)

Leave a Reply