«

»

ডিসেম্বর ০৭

কোন্ পন্থায় বামপন্থা-২

[পর্ব-১]
ভোগবাদী নাস্তিকদের পূজ্য পাশ্চাত্য সভ্যতা খৃষ্টীয় হলেও এটা সে অর্থে ধার্মিক নয়। পাশ্চাত্যের বেশীরভাগ একাডেমিকরা নিজেদের ধর্ম থেকে এক ধরণের দূরত্বে রাখতেই পছন্দ করেন। কারণ জানতে হলে তাকাতে হবে ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ খ্যাত ফরাসী বিপ্লবের সেই হিংসাত্নক ইতিহাসের দিকে। তৎকালীন ফরাসী সমাজকে বিশ্লেষণ করলে বিপ্লবটাকে একটা অনিবার্য ঘটনা বলেই মনে হবে। চার্চ এর পুরোহিত-তন্ত্রের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি একে অনিবার্য করে তুলেছিল। চার্চ এর সাথে যুক্ত হয়েছিল সমাজের প্রতিপত্তিসম্পন্ন ক্ষমতালোভীদের এই অনাচারে অংশগ্রহণ। ফলে এই অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের নেতৃত্ব নিতে নাস্তিকদের বেগ পেতে হয়নি। নাস্তিকরা এই নেতৃত্বের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করেছিল ভয়াবহ নৃশংসতা দ্বারা। নাস্তিকদের নেতৃত্বের আসনে বসতে পারার উদাহরণ খুব কম, তবে যে কয়েকবারই সুযোগ পেয়েছিল, তার প্রতি ক্ষেত্রেই অমানবিকতার ছাপ রেখেছিল! একটু অবাক হতেই হয় যখন তাদের মুখেই ফুটে নৈতিকতা ও অমানবিকতার খই!

১৮১৯ সালে ইংরেজ ক্যারিক্যাচারিস্ট জর্জ ক্রুইকশাঙ্ক তার ‘মৌলবাদের হাত’ নামক ক্যারিক্যাচারে নাস্তিকদের সেই নৃশংসতাকেই চিত্রিত করেছেন। ফরাসী বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় প্রায় এক বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে আনুমানিক ১৬,০০০ থেকে ৪০,০০০ লোক মারা যায়। গিলোটিন নামক হত্যার মেশিনটির পরিচিতিতে এই হত্যাযজ্ঞের বিশেষ ভুমিকা আছে। সন্ত্রাসের প্রায় সব নায়করাই ছিল নাস্তিক। ঠান্ডা মাথায় হত্যায় তাদের ছিল ব্যাপক খ্যাতি। আকন্ঠ দূর্নীতিতে নিমজ্জিত চার্চের একে প্রতিহত করার কোনো শক্তিই ছিল না। জনসাধারণ এতে স্বত:স্ফুর্ত অংশগ্রহণ করেছিল, কারণ তারাই ছিল সবচেয়ে নির্যাতিত। আর এতে অংশগ্রহণ না করে কোনো উপায়ও ছিল না। তাদের কষ্টার্জিত অর্থের প্রায় পুরোটাই চলে যেত ট্যাক্স ও উচ্চমূল্যের দরকারী জিনিষে, যেখানে চার্চ সহ ক্ষমতাশীলরা ভোগ করত লাগামহীন সুবিধা। বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া নাস্তিকরা ফ্রান্সে রচিত করে সেক্যুলারিজমের বীজ। বিপ্লবের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ চার্চ এর সব সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করে ও রাষ্ট্রের আনুগত্যকে বাধ্যতামূলক করে। ভ্যাটিকান এর প্রতিবাদও করেছিল। প্রতিক্রিয়াস্ব্ররূপ ফরাসীরা ভ্যাটিকানের দিকে মার্চ করে ১৭৯৮ ও ১৮০৯ সালে। নেপোলিয়ন অবশেষে চার্চ এর সাথে একটি দফারফায় আসেন। তবে এর জন্য চার্চকে তার নিজেকে বেঁধে ফেলতে হয়, আধ্যাতিকতার গণ্ডিতে। চার্চ সেই সীমাকে আজো অতিক্রম করতে পারেনি। এই ফরাসী বিপ্লবের ঢেউ ইউরোপের প্রায় সর্বত্রই পড়ে। কারণ ফরাসী সমাজব্যবস্থার সাথে ওসব দেশগুলোর পার্থক্য তেমন একটা ছিল না। তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফরাসীদের মতো তারা এতটা কট্টর ছিল না। আজও ইউরোপে ফ্রান্সকে সবচেয়ে বেশী সেক্যুলার বলে মনে করা হয়।

ফরাসী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া নাস্তিকদের সন্ত্রাসের রাজত্বে সবচেয়ে ঘৃণিত দলটি ছিল জেকোবিয়ান, যারা গিরন্ডিনসদের চেয়ে ছিল অনেক বেশী মৌলবাদী ও নৃশংস। রাশিয়ান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এই জেকোবিয়ান সন্ত্রাসীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত, মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লেনিনও তা অস্বীকার করেনি। কার্ল মার্ক্সের মতই, ফরাসী বিপ্লবের আধ্যাত্নিক গুরু ছিলেন ভলতেয়ার রুশোর মত দার্শনিকরা। এই ভলতেয়ার চার্চ এর একজন কট্টর সমালোচক ছিলেন। চার্চ এর বাড়াবাড়ি সেই সমালোচনার যোগ্যই ছিল। তবে ভলতেয়ার এর ব্যক্তিজীবনের দিকে তাকালে তাকে ধনীদের দলভুক্ত বলেই প্রতীয়মান হবে। অনেকটা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ অথবা বিবর্তনবাদীদের গুরু ডারউইনের মতো। ভলতেয়ার যে সমাজের নীচু ও অসহায় শ্রেণীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তা নয়, চার্চ ও সুবিধাভোগী ক্ষমতাশালীদের যথেচ্ছা সম্পদ ভোগের বিপরীতে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিজীবনে তার চাকচিক্যকে ঠিকই প্রকাশ করতে পছন্দ করতেন। তার পোষাক-আষাকেও ছিল আভিজাত্যের ছোঁয়া। তিনি যেসব বাড়িগুলোতে থাকতেন সেগুলোও ছিল চাকচিক্যময় যা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। লক্ষ্যণীয়, প্রগতির দাবীদার এ সময়ের ভোগবাদী নাস্তিকদের কাছে ডারউইনের মতই ভলতেয়ারও পূজণীয়!

উল্লেখ্য, ফরাসী বিপ্লব ধনীদের আলাদা মর্যাদাকে বিপন্ন করেছিল, আবার এটিই মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে তৈরী করেছে একটি বুর্জোয়া গোষ্ঠীর, ক্ষমতা বাঘ থেকে যেন সিংহের থাবায় স্থানান্তর। তবে এই বিপ্লব ফ্রান্সকে স্থিতাবস্থা দিয়েছে। পাশ্চ্যাতের অন্যান্য দেশগুলোর মতো শোষণ নিজ জনসাধারণের মধ্যে কমাতে পেরেছে, দিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু অন্য অনুন্নত জাতিগোষ্ঠীকে পদানত ও দাস বানাতে নতুন উদ্দমে ঝাঁপিয়ে পড়তে এই বিপ্লবের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। এসব বিবেচনায় নিলে মানব সভ্যতায় ফরাসী বিপ্লবের অবদান প্রশ্নবিদ্ধ হিসাবে থাকবে!

১ মন্তব্য

  1. নির্ভীক আস্তিক

    পড়ছি । তবে একটা প্রশ্ন- আলবেনিয়াতে নাস্তিকদের কুকরমের কোন সচিত্র বর্ণনা আছে ? সেখানে নাস্তিকদের উত্থান ও পতন এর পুরো ইতিহাস এবং পরে তারা ঠিক কাদের কাছে পরাজিত হয় – মুসলমানদের কাছে ? কোন বই এর রেফেরেন্স ? আমি উইকিপিডিয়াতে পড়েছি, কিন্তু সচিত্র বর্ণনা পেলে সুবিধা হত ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।