«

»

Sep ০৯

দি প্রফেট (দান বিষয়ে) – কাহলিল জিবরান

[লেবাননী কবি কাহলিল জিবরান ‘দি প্রফেট’ এর মাধ্যমে অতিন্দ্রিয় অনুভূতির সুন্দর প্রকাশ করেছেন। পাঠকের জন্য ‘দান বিষয়ে’ একটি চ্যাপ্টার তুলে দেয়া হল। মূল অনুবাদ: কবীর চৌধুরী, হাওলাদার প্রকাশনী]

তারপর একজন বিত্তশালী ব্যক্তি বললো (প্রফেটকে), দান করা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

আর তিনি উত্তরে বললেন:

তোমাদের ধনসম্পত্তি থেকে যখন তোমরা কিছু দান করো তখন সামান্যই দাও।

যখন তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে দাও তখনই সত্যিকার কিছু দাও।

কারণ তোমাদের ধনসম্পদ কী? সে সব তোমরা পাহারা দিয়ে রাখো, যেন আগামী কাল প্রয়োজনের মুহূর্তে তোমরা তা পেতে পারো।

আর আগামীকাল? যে অতি-দূরদর্শী কুকুর পবিত্র নগরীর পথে তীর্থযাত্রীদের অনুসরণ করার সময় দিকচিহ্নহীন বালুরাশির মধ্যে হাড়গোড় পুঁতে রাখে তোমাদের অবস্থাতো ঐ রকমই হবে।

আর প্রয়োজনের আশঙ্কা ওই প্রয়োজনটি ছাড়া আর কিছু কি?

তোমাদের কূপ যখন পূর্ণ তখন তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা কি সেই তৃষ্ণা নয়, যা কখনো মেটানো যায় না?

কিছু মানুষ আছে তারা তাদের প্রচুর সঞ্চয় থেকে খুব সামান্য দান করে, আর তারা দান করে স্বীকৃতি লাভের জন্য, আর তখন তাদের গোপন আকাঙ্খা তাদের দানকে অস্বাস্থ্যকর করে গেলে।

আর কিছু মানুষ আছে যাদের সঞ্চয় খুব সামান্য কিন্তু তাদের সবই তারা দান করে।

এরাই জীবন এবং জীবনের প্রাচুর্যে আস্থাবান, আর এদের সিন্দুক কখনোই শুন্য হয় না।

আর কিছু মানুষ আছে যারা দান করে সানন্দে, আর ওই আনন্দই তাদের পুরস্কার।

আর কিছু মানুষ আছে যারা দান করে বেদনার সঙ্গে, আর ওই বেদনা হল তাদের অগ্নিদীক্ষা।

আর কিছু মানুষ আছে যারা দান করে, আর ওই দানের সময় কোন বেদনা অনুভব করে না, তারা তার মধ্যে কোন আনন্দও খোঁজে না, ওই দানের সময় কোন পূণ্য সঞ্চয়ের কথাও তারা ভাবে না;

তারা দান করে ওইভাবে যেভাবে ওই উপাত্যকার চিরহতিৎ গুল্ম তার সুন্দর ঘ্রাণ মহাশুন্যে ছড়িয়ে দেয়।

এই রকম মানুষদের হাতের মধ্য দিয়েই বিধাতা কথা বলেন, আর তাদের চোখের পেছন থেকে তিনি ধরণীর দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসেন।

চাইলে পর দান করা ভালো, কিন্তু না চাইতে, উপলব্দি ক’রে, দান করা আরো বেশি ভালো।

আর মুক্তহস্ত মানুষের কাছে গ্রহীতার অন্বেষণ দানের আনন্দের চাইতেও বেশি আনন্দদায়ক।

আর দান না করে নিজের কাছে ধরে রাখার মতো তোমার কাছে কিছু রাখা কি উচিত?

তোমার যা কিছু আছে সবইতো একদিন দিতে হবে।

অতএব, এখনই দাও, দেওয়ার কাল তাহলে তোমারই হবে, তোমার উত্তরসূরীদের না তোমরা প্রায়ই বলো, আমি দেবো, কিন্তু কেবলমাত্র যোগ্য ব্যক্তিকে দেবো।

তোমার বাগানের ফলের গাছগুলি কিন্তু তেমন কথা বলে না, তোমার চারণক্ষেত্রের পশুরাও না।

তারা দেয় যেন তারা বাঁচতে পারে, কারণ না দিয়ে ধরে রাখলে তারা নিজেরা ধবংস হয়ে যাবে।

নিশ্চয়ই যে মানুষ তার দিবস-যামিনী প্রাপ্তির যোগ্য সে তোমার কাছ থেকেও সব কিছু পাওয়ার যোগ্য।

আর যে জীবনের মহাসাগর থেকে পান করার যোগ্যতা অর্জন করেছে তার নিশ্চয়ই তোমার ছোট্ট স্রোতস্বিনী থেকে তার পেয়ালা ভরে নেবার যোগ্যতাও আছে।

আর গ্রহণ করার মধ্যে যে সাহস, যে আস্থা, যে করুণা আছে তার চাইতে বড়ো কোনো মরুভূমি কি কোথাও দেখা যাবে?

আর তোমরা কারা যে তোমাদের জন্য মানুষ তাদের বক্ষ বিদীর্ণ করবে, তাদের অহংকারের পর্দা উন্মোচিত করবে, যেন তোমরা তাদের মূল্য খোলাখুলি ভাবে তাদের দেখতে পারো আর তাদের অহঙ্কারকে দেখতে পারো কোনো রকম লজ্জাবোধ দ্বারা না আক্রান্ত অবস্থায়?

প্রথমে দ্যাখো তোমরা দাতা হবার যোগ্যতা অর্জন করেছো কি-না, দান করার একটা হাতিয়ার হয়ে উঠছো কি-না।

কারণ, যথার্থই, জীবন দান করে জীবন, আর তোমরা যারা নিজেদেরকে দাতা মনে করো তোমরা আসলে শুধু সাক্ষী।

আর তোমরা যারা গ্রহীতা- তোমরা সবাই তো গ্রহীতা- তোমরা কৃতজ্ঞতার কোন দায় অনুমান করে নিও না, পাছে এর মাধ্যমে তোমরা তোমাদের কাঁধে একটা জোয়াল চাপিয়ে দেবে, আর যে দান করেছে তার কাঁধেও,

বরং দাতার সাথে এক সঙ্গে তার দানের ঊর্ধ্বে উঠে যাও, যেন পাখায় ভর দিয়ে;

কারণ তোমার ঋণ সম্পর্কে অতিসচেতনতার অর্থ হবে তাঁর ঔদার্যে সন্দেহ করা, যার মাতা হলেন মুক্ত হৃদয়ের ধরণী, আর পিতা বিধাতা।

৭ comments

Skip to comment form

  1. 4
    এস. এম. রায়হান

    দারুণ একটা পোস্ট। খুব ভালো লাগলো।

    1. 4.1
      শামস

      এটার জন্য জিবরান ধন্যবাদ পাবে, আমারও ভাল লেগেছে, তাই শেয়ার করলাম।

       

       

  2. 3
    মুনিম সিদ্দিকী

    কবির নাম কি কাহলিল হবে? না খলিল হবে?

    1. 3.1
      শামস

      কাহলিল জিবরান, সেটাই দেখছি। আরবীতে হয়তো 'খলিল'! সে খৃষ্টান, তাই কাহলিল'টাই বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে লেখা হতে পারে।।

  3. 2
    মুনিম সিদ্দিকী

    আর কিছু মানুষ আছে যারা দান করে, আর ওই দানের সময় কোন বেদনা অনুভব করে না, তারা তার মধ্যে কোন আনন্দও খোজে না, ওই দানের সময় কোন পূণ্য সঞ্চয়ের কথাও তারা ভাবে না;

    তারা দান করে ওইভাবে যেভাবে ওই উপাত্যকার চিরহতিৎ গুল্ম তার সুন্দর ঘ্রাণ মহাশুন্যে ছড়িয়ে দেয়।

     

    আমার মনের মত কথা!!

  4. 1
    কিংশুক

    আলহামদুলিল্লাহ! কত সুন্দর কথা। রাসূল (সা:) এর কথা আর কাজের পুরোপুরি মিলের সাথে আর কোন্ মানুষের তুলনা হতে পারে? তিনি নিজের পরিবারের জন্যও সম্পদ সঞ্চিত করে না রেখে মানুষকে দান করে গেছেন। এতিম,মিসকিন,মুসাফির,অসহায়, শ্রমিক, দাস সহ সকল গরীব মানুষের জন্য, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন। মালিক, শ্রমিক, সাদা, কালো, উচ্চবংশীয়, নিম্নবংশীয় এমনকি দাসদের পর্যন্ত সমান অধিকারের মানুষ হিসাবে ঘোষনা করে গেছেন। তিনি বেহেশতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থানের প্রতিশ্রুতি পাবার পরও ইবাদত, আমল, ভদ্র নম্র ভালো ব্যবহার হতে সর্ব বিষয়ে সবার সেরা মানুষ ছিলেন। তাঁর পূর্বে কোন মানুষ তাঁর সমপর্যায়ের ছিলোনা, তাঁর পরেও কেউ আসবেনা। তাঁর চরিত্রের আদর্শ সকল মানবকুলের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ। সমগ্র আরবের শাসনভার যাঁর হাতে ছিলো তাঁর জীবনযাপন ছিলো অতি সাধারন। তাঁর অনুপম চরিত্রের অনুসারী তাঁরই সাহাবা খোলাফায়ে রাশেদিন গণ রাসূলের (সা:) এর আদর্শ অনুযায়ী জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন। ধন সম্পদের, আরাম আয়েশ, প্রভাব প্রতিপত্তির লোভ তাঁদের ছিলোনা, তাঁদের ছিলো সকল মানুষের অধিকার রক্ষা করার জন্য আল্লাহ পাক তাঁর খলিফা স্বরুপ যে মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন তা সঠিক ভাবে পালন করার চেষ্টা। ধন সম্পদ, মান মর্যাদা, সম্মান সবই কিছু দিনের জন্য দুনিয়ায় আল্লাহর আমানত হিসাবে তাঁরা দেখেছেন। সকল ইতিহাস তাঁদের স্বাক্ষি। মুসলমানদের চরিত্র ছিলো তেমনই। সেই মুসলমানদের আজ কি চরিত্র? অথচ সবাই নোংরা, নানান মিথ্যার আশ্রয় নেয়া, ইসলামের বিরোধী অনেক কিছু মেনে নিয়ে রাজনীতি করে নাকি ইসলাম কায়েম করবেন?? কাদেরকে আল্লাহপাক দুনিয়ায় মানবজাতির জন্য আবার খিলাফত দান করবেন? আমি আরেকটি হাদিস পড়েছিলাম, রাসূল (সা:) কে একজন সাহাবী (রা:) পাপ পুন্যের কথা জিঞ্জেস করলে তিনি বলেন, যে কাজ করলে তুমি মনে শান্তি পাবে তাই পুন্য। আর যে কাজ করলে তোমার বিবেক তোমাকে পীড়া দিবে তাই পাপ। অনেকে অন্য রকম বলতে পারে কিন্তু এটাই সঠিক (কোন সংকলনের হাদিস তা আর মনে নাই)।

               আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মানব কুলের আদর্শ হযরত মোহাম্মদ (সা:) যিনি সারাজীবন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে কত হাজার কষ্ট সহ্য করে গেছেন তাঁকেই যখন কাফের,মুশরিক, মুরতাদরা গালাগালি করে তখন তাঁর একজন নিতান্ত দূর্বল উম্মতের হৃদয়ও কিভাবে ঠিক থাকে? আল্লাহ পাক তাদের হেদায়াত দিন, আমাদেরকে এই চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার মতো ধৈর্য, জ্ঞান, সাহায্য দান করুন।

    1. 1.1
      শামস

      ধন্যবাদ, মন্তব্যের জন্য।

       

Leave a Reply