«

»

মে ২২

আমার যত সংশয় (পর্ব-১)

একটি নাস্তিক পরিবারে আমার জন্ম। মা, বাবা, ভাই কাউকেই কখনো ধর্মের ধারে কাছেও ঘেষতে দেখিনি। সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং দারুণ ব্যস্ত। মা একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট। বাবা বাংলাদেশ সরকারের একজন সিনিয়র সচিব। বড় ভাই হাভার্ডে পিএইচডি করছেন। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সাপেক্ষে সম্ভবত আমরা উচ্চবিত্ত। বিলাসের উপকরণের খুব বেশী অভাব নেই। সময়মত হাল মডেলের প্রাইভেট কার কিনতে খুব বেশী বেগ পেতে হয় না। সাধারণ অসুখ-বিসুখেও আমার পরিবার এপোলো আর স্কয়ার হাসপাতালের উপরেই আস্থা রাখে। আর প্রায়োজনে তো সিংগাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ আছেই!

যাকগে, এবার আসি মূল আলোচনায়। আমার বাবা একজন আগাগোড়া বস্তুবাদী মানুষ। তিনি প্রায়ই বলেন- বিজ্ঞান-যুক্তি আর বস্তুর সঠিক ব্যবহার মানবজাতির উন্নয়নের আসল চাবি কাঠি। বানর জাতীয় প্রাণী থেকে মানুষ সভ্য জাতীতে পরিণত হয়েছে কেবল বিজ্ঞান প্রযুক্তি আর পদার্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। মানব সভ্যতা বিকাশে ঈশ্বর, নবী -রাসূল এদের কোন ভূমিকা নেই। 

আমার বাবার এসব কথা আমার মনে গভীর রেখাপাত করে। আমি বাবার এসব কথা নিয়ে মাঝে মাঝে ঘন্টার পর ঘন্টা চিন্তায় নিমগ্ন হই। আমি সাধারণত কোন কথাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করে মেনে নিই না। নিরপেক্ষ আর যৌক্তিক বিশ্লেষণ আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তাই আমার মনে বার বার প্রশ্ন জাগে – প্রাণহীন জড় বস্তু থেকে কি প্রাণ আদৌ তৈরী হতে পারে? এই উন্নত মানবজাতী কিভাবে পৃথিবীতে এল? রাতের আকাশের কোটি কোটি নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, নিহারীকা, ছায়াপথ, নেবুলা এগুলো কি শূন্য থেকে একাকীই তৈরী হতে পারে? মায়ের গর্ভে একজন বুদ্ধিমান মানুষ তৈরী হতে কোন অতিবুদ্ধিমান নিয়ন্ত্রকের  কি কোন প্রায়োজন নেই? প্রতিটা মৌলিক কণা কেন সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে আর নিদৃষ্ট বিক্রিয়ায় অংশ নেয়? পৃথিবীর সব কিছু এত সুনিয়ন্ত্রিত কেন?  

আমি জানি এসব প্রশ্ন অত্যন্ত মৌলিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি আমার প্রিয় বন্ধুদের সাথেও এসব প্রশ্ন শেয়ার করতে পারি না। কারণ কেন যেন আজকালকার আধুনিক মানুষ এসব নিয়ে প্রশ্ন করতে চায় না। প্রশ্ন করলে বোকা ভাবে। সবাই সবকিছুর দায়িত্ব বিজ্ঞানের উপর ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। সবাই নিজ নিজ কর্মব্যস্ততায় নিমগ্ন। খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারলে আর কিছু চায় না।

আমি নিজে নিজেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। ইন্টারনেট, জার্নাল, ব্লগ ঘাঁটতে থাকি। দেখি বিজ্ঞান আমার প্রশ্নের সত্যিকার অর্থেই কোন প্রমাণ-ভিত্তিক আর সুনিশ্চিত উত্তর দিতে পারে না। বরং আমার মত বিজ্ঞানও এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছে। এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান বিভক্ত। 

প্রথমেই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব কিভাবে এল, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ নামের এই জটিল আর উন্নত প্রাণীটি অজৈব তথা প্রাণহীন জড় বস্তু থেকে দৈবাত একটি সরল এককোষী জীব হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেছে এবং কোটি কোটি বছর সময়ের ব্যবধানে সেই এককোষী জীবটিই উন্নত বুদ্ধিমত্তার ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানব জাতীতে পরিণত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, বস্তুবাদী ধারণা অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব হঠাৎ, নিয়ন্ত্রনহীন আর অপরিকল্পিতভাবে (spontaneous, random) হয়েছে। 

অর্থাৎ, জড় — দৈবাত জীবন লাভ — একটি কোষ — বিবর্তন — মানুষ

তার মানে একটি জড় মৌলিক অথবা যৌগিক কণা প্রাণলাভ করতে পারে এবং কোন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই পর্যায়ক্রমে মানুষের মত জটিল সৃষ্টিতে পরিণত হতে পারে। এককথায় কোন জড় কণা উপযুক্ত পরিবেশ আর যথেষ্ট সময় পেলে সেটি মানুষে পরিণত হওয়া সম্ভব– এটাই হচ্ছে বস্তুবাদী ধারনণা। কিন্তু এই বস্তুবাদী ধারণার প্রতি আমি সংশয়বাদী। কারণ জড় কণার দৈবাত প্রাণ লাভ, কিছুতেই প্রমাণিত নয়।

আসুন দেখা যাক একটি জ়ড় কণা থেকে জীবন আসতে হলে কী কী ধাপ অতিক্রম করতে হবে–

১/ প্রথমে কিছু সরল জড় কণাকে সতঃস্ফুর্ত, নিয়ন্ত্রণহীন (spontaneous, random) রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জটিল জৈব কণা বা নিউক্লিক এসিড মলিকিউলে পরিণত হবে।

২/ জটিল জৈব কণা বা নিউক্লিক এসিড মলিকিউলগুলোর সাথে নানা ধরণের এনজাইম ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান (nutrient molecules) একটি কোষ ঝিল্লির (membraned cells) মধ্যে আবদ্ধ হতে হবে।

৩/ কোষের নিউক্লিক এসিড মলিকিউলগুলো (ডিএনএ) সেল্ফ রেপ্লিকেশন এবং সেল ডিভিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন নতুন কোষ উৎপাদন করতে থাকবে।

—– এভাবে সরল জড় কণা উপযুক্ত পরিবেশে সম্পূর্ণ সতঃস্ফুর্তভাবে, নিয়ন্ত্রণহীন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত জটিল জীবকোষে পরিণত হতে পারে। 

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখনকার পৃথিবীতে প্রাণধারণ আর প্রাণ সৃষ্টির যথেষ্ট উপযুক্ত পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও এভাবে কোন জড় কণা  সতঃস্ফুর্তভাবে, নিয়ন্ত্রণহীন প্রক্রিয়ায় জীবকোষে পরিণত হয় না। এমনকি পরীক্ষাগারে পৃথিবীর আদি পরিবেশ কৃত্তিমভাবে তৈরী করেও কোন জড় কণাকে জীবন্ত সরল কোষে পরিণত করা যায়নি।

তার মানে প্রাণ থেকে প্রাণ, ব্যাকটেরিয়া থেকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস থেকে ভাইরাস, মানুষ থেকে মানুষ।

এভাবে নানা প্রশ্ন আর অনুসন্ধান আমাকে বস্তুবাদের প্রতি সংশয়বাদী করে তোলে। একটি অবিশ্বাসী, বস্তুবাদী আর বিজ্ঞান-মনষ্ক পরিবারে জন্ম নিয়েও ঈশ্বর নামের অতিবুদ্ধিমান সত্ত্বার প্রতি অনাস্থা আনতে পারি না। 

আমি বিজ্ঞানের প্রতি অন্ধ আস্থা স্থাপনে রাজী নই। বিজ্ঞান ঘটনার পেছনের কার্যকারণকে খুঁজ়ে পেতে চেষ্টা করে। আমার মনে যে প্রশ্নগুলো জাগে, সেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর একদম সঠিক প্রমাণ-ভিত্তিক উত্তর যতক্ষণ বিজ্ঞান দিতে না পারছে, ততক্ষণ বস্তুবাদের প্রতি আমার সংশয় কাটবে না। আমি জানি, আমার মত বিজ্ঞানও এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছে।

 

abiogenesis

চলবে—

১৭ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. এস. এম. রায়হান

    অল্প কথায় উপস্থাপনা চমৎকার হয়েছে। চালিয়ে যান…

    1. ১.১
      শামসুল আরেফিন

      ধন্যবাদ রায়হান ভাই, পড়া এবং সেই সাথে উতসাহ দেবার জন্য।

  2. মুনিম সিদ্দিকী

    আমার মনে হচ্ছে এই ধরণের ব্লগ বা লেখা যেন কোথাও পড়েছিলাম!!!

    1. ২.১
      শামসুল আরেফিন

      মুনিম ভাই , গত রাতে বলতে গেলে না ঘুমিয়ে পোস্ট লিখেছি। হতে পারে আমার লিখার সাথে অন্য কারো লিখার মিল থাকতে পারে। বস্তুবাদ নিয়ে সংশয়বাদী আমি একাই নই। আরো অনেকেই আছেন । আমার সংশয়ের সাথে অন্য কারো সংশয় মিলে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়।

  3. ফাতমী

    উপরের লেখায় বর্নিত আমি টা কে জানতে চাই। এটা কি লেখক নিজে? প্রশ্নটা শুধুই সত্য জানার জন্য। মাফ করবেন, অনেক নাস্তিকদের দেখেছি এভাবে লিখে সে অনেক অনেক ধার্মিক পরিবারের সন্তান, ্তারপরই লেখায় …….. শুরু হয়ে যায়। বস্তুত আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ ধরনের অনেক কাহিনীর কোন সত্যতা নেই, কারণ ইসলাম সম্পর্কে অনেক ফান্ডামেন্টাল অনেক অনেক সাধারণ প্রশ্নের জবাব দিতে না পারায় বুঝতে পেরেছিলাম, এগুলো মিছা্মিছি লেখা-অবশ্যই সব গুলো নয়। মানুষকে ধোকা দিবার স্টাইল। এ জন্য সতর্কতা মূলক প্রশ্ন।

    যদি লেখক নিজেই হইয়ে থাকেন, তাহলে দোয়া করি, যেন আল্লাহ পাক আপনাকে অনেক অনেক বড় করেন। আমিন।

    1. ৩.১
      এস. এম. রায়হান

      মন্তব্যের আগা-মাথা কিছুই বুঝলাম না।

    2. ৩.২
      শামসুল আরেফিন

      ফাতমী, আমার ধারনা , শুধু আমি একাই নই , বরং পৃথিবীর বিপুল পরিমান মানুষের মনে আমার মতই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। আমি যদি নিজে সংশয়বাদী না হতাম , তবে সময় নষ্ট করে এই পোস্ট লিখার কোন প্রয়োজন ছিল না।

      শুধু আমার নিজের পরিবারের কথা নয়, বরং চারদিকের অনেক মানুষ, আমার অনেক বন্ধু , নিকটজন আছেন যারা নিজের অজান্তে বিনা দ্বিধায়, বিনা প্রশ্নে বস্তুবাদের উপর আস্থাশীল হয়ে উঠছেন । অথচ এমন অনেক মৌলিক প্রশ্ন আছে যেগুলোর  অনুসন্ধান মানুষের মধ্যে বস্তুবাদী ধারনা পরিবর্তে নতুন ধরনের ভাবনার উন্মেষ ঘটাতে পারে।

      বিজ্ঞানের প্রতি অন্ধ ভক্তি নয়, বরং আমি চাই সবাই প্রশ্ন  করুক আর তার উত্তর খুঁজে পেতে চেষ্টা করুক ।

      1. ৩.২.১
        ফাতমী

        আপনার পরবর্তী লেখার জন্য অপেক্ষায় আছি। আপনি পরের পর্বগুলিও লিখা শুরু করুন। অনেক দিন যাবত আপনার কোন লিখা নাই।

  4. মোঃ তাজুল ইসলাম

    @আরেফিন ভাই,

    "সেল্ফ রেপ্লিকেশন" সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। দয়া করে ব্যাখ্যা করবেন।

    সুন্দর উপস্থাপন করেছেন। আশা করি, পরবর্তী পর্ব আরও বড় করে লিখবেন। ভাল থাকুন।  

  5. নছীম

    ধন্যবাদ, এধারার অনেক লেখা চাই ৷

  6. imtiaj forhad

    পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম । 

  7. আরাফাত কামাল তামজিদ

    সংক্ষেপে সুন্দর উপস্থাপন! ঠিক একই প্রশ্ন আমার মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে।

  8. সারওয়ার

    অনেক ভালো লেগেছে। চালিয়ে যান। আমি নিজেও এ ব্যাপারে যামেলায় আছি, স্যাররা কি সব হাবিজাবি থিওরি পড়ায়!

  9. Khairul

    সংক্ষেপে সুন্দর উপস্থাপন , অনেক ভালো লেগেছে

     

  10. ১০
    শাফিউর রহমান ফারাবী

    ভাইয়া আপনার লেখা এই ব্লগটা আমি আমার এই নোট  <a href="https://www.facebook.com/note.php?note_id=799683256711571"&gt;বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, নাস্তিক্যতাবাদ ও ইসলাম; আপনি এখন কোনটির প্রতি ঈমান আনবেন ?</a>  এ ব্যবহার করেছি। 

  11. ১১
    liakat jowardar

    গবেষণামূলক লেখারজন্য ধন্য।

  12. ১২
    কিংশুক

    jajakallah

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।