«

»

অক্টো. ১৮

রিচার্ড ডকিন্সের নাস্তিকীয় যুক্তি

নতুন একটি যন্ত্র দেখে যেকারো মনে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে সেটি হচ্ছে-

১. যন্ত্রটি কে (Who) বানিয়েছে? অথবা, যন্ত্রটির মেকার কে?

এরপর কারো কারো অনুসন্ধিৎসু মনে যে প্রশ্নটি আসতে পারে সেটি হচ্ছে-

২. যন্ত্রটি কীভাবে (How) তৈরী করা হয়েছে?

অথচ বাংলা নাস্তিকদের আধুনিক, অভ্রান্ত, ও দেবতুল্য গুরু রিচার্ড ডকিন্সের যুক্তি অনুযায়ী "কে (Who)" দিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। কেননা "কে" দিয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে যেহেতু কাউকে ইনভোক করা হয় সেহেতু এটা কোনো প্রশ্ন নয় – মানে 'ভুল' বা 'অযৌক্তিক' প্রশ্ন! এজন্য প্রশ্ন করতে হবে "কীভাবে (How)" দিয়ে। অর্থাৎ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১ম প্রশ্নটাই নাস্তিকদের কাছে কোনো প্রশ্ন নয়, কিন্তু ২য় ও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটাই তাদের কাছে 'যৌক্তিক' প্রশ্ন! কেন? কারণ, এই মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে ১ম প্রশ্নটি করার সাথে সাথে একজন স্রষ্টাকে মেনে নিতে হবে এই ভয়ে! এজন্য তারা ১ম প্রশ্নটাকে বেমালুম "নাই" করে দিয়ে শুধু ২য় প্রশ্নের মধ্যে মাথা গুঁজে থেকে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির কিছু হাইপোথিটিক্যাল ব্যাখা দেখিয়ে দাবি করছে এই বলে যে, এই মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যেহেতু আমাদের হাতে আছে সেহেতু এই মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টা নাই বা থাকার কোনো দরকার নাই! কোনো কিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখা জেনে গেলে নাকি সেটির কোনো মেকার থাকার দরকার পড়ে না! ব্যাপক বিনুদুন! এটা হচ্ছে বিজ্ঞানের অজুহাত দিয়ে মৌলিক প্রশ্নের গলা চেপে ধরে সত্যকে অস্বীকার করার নাস্তিকীয় ধান্দা। পাঠকদের বুঝার সুবিধার জন্য এই ধরণের নাস্তিকীয় যুক্তির কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো।

১.

ভুল প্রশ্ন: এই মহাবিশ্ব কে সৃষ্টি করেছে?

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে? {এই প্রশ্নের দ্বারা প্রমাণ হয় যে, এই মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টা নাই!}

অনুরূপভাবে, নাস্তিকীয় যুক্তি অনুযায়ী-

২.

ভুল প্রশ্ন: রেডিও, ঘড়ি, টিভি, কম্পুটার, ক্যামেরা, সেলফোন, ইত্যাদি যন্ত্রগুলো কারা তৈরী করেছে?

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: এই যন্ত্রগুলো কীভাবে তৈরী হয়েছে? {মানে এগুলোর কোনো মেকার নাই!}

৩.

ভুল প্রশ্ন: আইফেল টাওয়ার, সিয়ার্স টাওয়ার, পেট্রোনাস টাওয়ার, ও বুর্জ খলিফার মতো স্থাপনাগুলো কারা তৈরী বা ডিজাইন করেছে?

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: এই স্থাপনাগুলো কীভাবে তৈরী হয়েছে? {মানে এগুলো কেউ তৈরী বা ডিজাইন করেনি!}

৪.

ভুল প্রশ্ন: মোনালিসা ও দ্য লাস্ট সাপারের মতো চিত্রকর্ম কে অঙ্কন করেছে? 

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: চিত্রকর্মগুলো কীভাবে অঙ্কিত হয়েছে? {মানে এগুলো কেউ অঙ্কন করেনি!}

৫.

ভুল প্রশ্ন: বাবরী মসজিদ ও টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য দায়ী কারা?

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: এগুলো কীভাবে ধ্বংস হয়েছে? {মানে এগুলোকে কেউ ধ্বংস করেনি!}

৬.

ভুল প্রশ্ন: মিস জেনীকে কে ধর্ষণ করেছে?

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: মিস জেনী কীভাবে ধর্ষিত হয়েছে? {মানে ধর্ষক বলে কিছু নাই!}

৭.

ভুল প্রশ্ন: "প্রজাতির উৎপত্তি" নামক বইটির লেখক কে?

নাস্তিকীয় প্রশ্ন: বইটি কীভাবে লিখিত হয়েছে? {মানে লেখক বলে কিছু নাই!}

 

নাস্তিকীয় যুক্তি অনুযায়ী তাহলে সাধারণ জ্ঞানের বই-পুস্তকে বিভিন্ন আবিষ্কার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো করা হয় সেগুলো আসলে ভুল প্রশ্ন! যেমন:

– টিভি-র আবিষ্কর্তা কে?

নাস্তিকীয় যুক্তি অনুযায়ী এই প্রশ্নটির দ্বারা যেহেতু কাউকে ইনভোক করা হয় সেহেতু এটি একটি ভুল প্রশ্ন! সঠিক প্রশ্নটি হবে- টিভি কীভাবে তৈরী হয়েছে? অর্থাৎ নাস্তিকীয় যুক্তি অনুযায়ী টিভি-র কোনো আবিষ্কর্তা নাই! 😛

এইযে আইফোনটা দেখছেন। রিচার্ড ডকিন্সের নাস্তিকীয় যুক্তি অনুযায়ী "আইফোনটা কে তৈরী করেছে?" জাতীয় প্রশ্ন করা যাবে না! তার পরিবর্তে প্রশ্ন করতে হবে, "আইফোনটা কীভাবে তৈরী হয়েছে?" এভাবে "কে তৈরী করেছে?" জাতীয় প্রশ্ন না করে "কীভাবে তৈরী হয়েছে?" জাতীয় প্রশ্ন করে কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেই আইফোনের কোনো মেকার থাকবে না কিংবা থাকার দরকার পড়বে না! 😀

iphone

একইভাবে, নাস্তিকীয় যুক্তি দিয়ে যেকোনো জিনিসের মেকারকে "নাই" করে দেওয়া সম্ভব! এটা হচ্ছে নাস্তিকীয় ম্যাজিক 😀 দারুণ না!?

নোট: একই জিনিসের ক্ষেত্রে "কে" ও "কীভাবে" দিয়ে প্রশ্ন দুটি স্বতন্ত্র ও আলাদা। দুটোই যৌক্তিক প্রশ্ন, এবং দুটি প্রশ্নের উত্তর দু'ভাবে বা দু'পন্থায় খুঁজতে হবে। কিন্তু কেউ যদি বিজ্ঞানের অজুহাত দেখিয়ে "কে" দিয়ে প্রশ্নকে বাতিল করে দিতে চায় তাহলে বুঝতে হবে সে আসলে বিজ্ঞানের নামে ধান্দাবাজি করছে, সে মৌলিক প্রশ্নের গলা চেপে ধরে তার নিজস্ব ডগম্যা প্রমোট করতে চায়।

৫ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. Liakat Jowardar

    বর্ণিত বিষয়টিতে ‘কে তৈরি করেছেন’ এবং ‘কীভাবে তৈরি হয়েছে’ এই দুটি প্রশ্নের মধ্যে অর্থগত পার্থক্য কী ঠিক বুঝলাম না। বিষয়টির উত্তর দিতে গেলেই আবিষ্কারকের নাম অবশ্যই বের হয়ে আসবে।

    1. ১.১
      এস. এম. রায়হান

      দুটি প্রশ্নের মধ্যে অর্থগত পার্থক্য অবশ্যই আছে, এবং দুটি প্রশ্নের উত্তরও এক না। ‘কে তৈরি করেছে’ প্রশ্নের উত্তরে কর্তা তথা একজনের নাম চলে আসবে। অন্যদিকে ‘কীভাবে তৈরি হয়েছে’ প্রশ্নের উত্তরে কারো নাম আসবে না। এক্ষেত্রে জিনিসটা কী দিয়ে ও কীভাবে তৈরী হয়েছে তার একটা ব্যাখ্যা আসবে মাত্র।

  2. অভিষেক

    ঘড়ি,টিভি,কম্পিউটার, অাইফোণ বা বুর্জ খলিফা কে তৈরী করেছে, তা যেকোন মানুষ ইচ্ছে করলেই কারখানায় বা বিল্ডিং সাইটে গিয়ে দেখে অাসতে পারে! তাছাড়া এইসব মানবীয় অাবিষ্কার বা নির্মাণ কোন একজন মানুষের দ্বারা সম্পন্ন হয়নি! হাজার হাজার বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, নকশাকার মিলে এইগুলো তৈরী করেছেন এবং তাদের পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, যাতে করে পরবর্তীকালের মানুষ সেই জ্ঞান অাবার ব্যবহার করতে পারে। সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ অযৌক্তিক!

    1. ২.১
      এস. এম. রায়হান

      প্রকৃতি জগত থেকে উদাহরণ দেওয়া হয় ব্যাপারটাকে সহজবোধ্যভাবে বুঝানোর জন্য। কাজেই এখানে 'অযৌক্তিক' 'আযৌক্তিক' বলে লাফানোর কিছু নাই। আর "ঘড়ি, টিভি, কম্পিউটার, আইফোন বা বুর্জ খলিফা কে তৈরী করেছে, তা যেকোন মানুষ ইচ্ছে করলেই কারখানায় বা বিল্ডিং সাইটে গিয়ে দেখে আসতে পারে!" কথাটা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। যেমন, জন্মান্ধদের এগুলো দেখানো সম্ভব নয়। তাছাড়া শুধুমাত্র একটি আইফোন সেট সাথে নিয়ে আমাজন জঙ্গল কিংবা ভিনগ্রহের বাসিন্দাদের বুঝানোর ব্যাপারটা তো থাকছেই। এ প্রসঙ্গে অন্য একটি পোস্টে অনেক আগেই বলেছি।

  3. মিলন

    আপনি ঘড়ির মেকারের সাথে বিশ্ব স্রষ্টার উদাহরন দিয়েছেন। কিন্তু আমার কথা হল, এই দুটি উদাহরন কতটুকু একটার সাথে আরেকটার সমন্জস্যতা রয়েছে? কিছু কিছু প্রশ্ন এমন আছে যে, প্রশ্নের মধ্যেই পরোক্ষভাবে উত্তর গুঁজে দেয়া থাকে। আর আরেকটা ব্যাপুক বিনুদুন হল, বিজ্ঞান যে রহস্য সমাধান করতে পারে না, সেখানেই ধর্ম স্রষ্টাকে গুঁজে দিয়ে রহস্য সমাধান করে। এক সময় প্রশ্ন করা হত, এই পৃথিবী সৃষ্টি কে করেছে? উত্তর ঈশ্বর। কারন, তখনো পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য উন্মোচিত হয়েছিল না। বিজ্ঞান যখন প্রমান করল যে, পৃথিবী কেহ সৃষ্টি করে নি, ইহা সূর্য থেকে সৃষ্ট। তখন ধর্ম প্রশ্ন করে, তাহলে সূর্যের স্রষ্টা কে? উত্তর ঈশ্বর। কেননা, সূর্য সৃষ্টির রহস্য তখনো জানা যায় নি। পরে যখন প্রমান হল যে, সূর্যও কেহ সৃষ্টি করে নি, বরং মহা বিস্ফোরনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। ধর্ম তখন প্রশ্ন করে, তাহলে ঐ বিস্ফোরন কে ঘটালো? উত্তর স্রষ্টা। কারন, এর রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয় নি। যেদিন হবে, সেদিন হয়তো স্রষ্টাকে আবারো সেই রহস্যের পেছনে দাঁড় করানো হবে।

    অপরদিকে ঘড়ি কে সৃষ্টি করেছে, এই প্রশ্নের উত্তর আসবে একটা জাতির প্রতি ইংগিত দিয়ে, মানে ঘড়ি যারা তৈরি করে। একটা মানুষ দিয়ে একটা জাতি হয় না। একটা ঘড়ি একজন ই তৈরি করে। কিন্তু অগনিত ঘড়ি নিশ্চয় একজনে তৈরি করে না। অনন্ত মহাবিশ্বের মিলিয়ন বিলিয়ন সৃষ্টির জন্য কি একাধিক স্রষ্টা আছে?

    আমার নিকট উদাহরন দুটি সামন্জস্যপূর্ন হল না ভাই। দুঃখিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।