«

»

মে ২২

‘কৃত্রিম প্রাণ’ ও বদ্ধমনাদের আস্ফালন

২০ শে মে ২০১০, তথাকথিত মুক্তমনাদের আনন্দ-আস্ফালনের দিন; কেননা, এদিন নাকি ‘কৃত্রিম প্রাণ’ তৈরী হয়েছে, মানুষের হাতেই, ক্রেগ ভেন্টরের গবেষণাগারে। বিবিসি সহ পৃথিবীর প্রায় সকল দৈনিকে এটাই ছিল প্রথম পাতার খবর। খবরটা পড়ে কিছুটা ভিমরী খেলাম; সংশয় আর ঔৎসুক্য নিয়ে খবরটা পড়ে কিছুতেই বুঝলামনা যে এই আবিষ্কারকে কীভাবে ‘কৃত্রিম প্রাণ’ বলা হল। যাইহোক, মিডিয়াতে আসা খবরগুলো থেকে আমি যা বুঝেছি তা অনেকটা এমন:

১. কীভাবে ‘কৃত্রিম প্রাণ’ তৈরী হল তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার চাইতে অন্যান্য বিষয়াদির ওপর বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; যেমন, এই আবিষ্কারের ফলে ভবিষ্যতে কী হবে, এর প্রায়োগিক দিকের নৈতিকতা কতটুকু… ইত্যাদি। মোদ্দাকথা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি ভাসা-ভাসা ভাবে এসেছে।

২. তারপরেও যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বর্ণনা পেয়েছি, তা দেখে আমার বুঝতে বাকি রইলনা যে, আবিষ্কারক মিডিয়াকে ‘মুরগী দেখিয়ে ডাল খাইয়েছেন’। মনে হলো, বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিবৃত্তির অভাবে হয়ত সাংবাদিকরা আবিষ্কারককে বেশী প্রশ্ন করার চাইতে ভেন্টর যা বলেছেন তাই হুবহু ছেপে গেছেন। আর সাথে সাথে এই ধারণাও উঁকি দিল যে, বদ্ধমনাদের আস্ফালন কখন শুরু হবে? দিনের মাঝামাঝি যেতে না যেতেই তাদের গুরু অভিজিৎ রায় ‘ঈশ্বর’ হওয়ার খায়েশ প্রকাশ করে জোড়াতালি দেয়া লেখাটা প্রকাশ করলেন বদ্ধমনার ব্লগে।

৩. কিন্তু বেশ আকর্ষণীয় ব্যাপারটা হল, অভিজিৎ রায়ের লেখার শেষাংশে প্রতিপক্ষ থেকে কী ধরণের যুক্তি আসতে পারে তার সারাংশ বর্ণনা করেছেন। অভিজিৎ রায় একজন প্রাজ্ঞ বিজ্ঞানবোদ্ধা ব্যক্তি। উনি নিজেই হয়ত বুঝেছেন যে, আবিষ্কারটাকে ‘কৃত্রিম প্রাণ’ বলে গুলে খাওয়ানো বোধ হয় কষ্টসাধ্য হবে; তাই, ‘কৃত্রিম প্রাণের’ প্রস্তাবনায় যে দুর্বলতাগুলো উনি নিজে দেখেছেন সেগুলোকেই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের আক্রমণের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুঃখ এই যে উনি নিজের সংকীর্ণ গোষ্ঠীপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারলেন না।

কিছুটা বিস্তারিত করে লিখি। ভেন্টরের গবেষনাগারে কি আসলেই কৃত্রিম প্রাণ তৈরী হয়েছে? পদ্ধতিটির বিবরণ আছে ভেন্টরের ওয়েবসাইটে, পড়লে আপনারা সবাই বুঝবেন যে, বিভিন্ন ইষ্ট (Yeast, এক প্রজাতির ছত্রাক) থেকে ডিএনএ’র অংশবিশেষ নিয়ে জোড়া-তালি দিয়ে উনারা একটা ব্যাক্টেরিয়ার জিনোম পরম্পরা কম্পিউটার এর সহায়তায় গবেষণাগারে সংশ্লেষণ করলেন; আর এটাকেই নাম দিলেন ‘কৃত্রিম প্রাণ’। এক্ষেত্রে, ডিএনএ গুলো কিন্ত মৌলিক পদার্থ থেকে (কিংবা কোন অজৈব পদার্থ থেকে) গবেষণাগারে সংশ্লেষণ করা হয়নি; এমনকি ডিএনএ গুলো জোড়া লাগানোর বিভিন্ন পর্যায়ে তারা সাহায্য নিয়েছেন জীবিত ইষ্টের। পদ্ধতির শেষাংশে আবার এই সিন্থেটিক জিনোমটি একটা জীবিত ব্যাক্টেরিয়ার ক্রোমজোমে প্রতিস্থাপিত করা হয়। আমি পুরো ব্যাপারটাকে একটা সফল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে রাজী আছি, কিন্তু কোনোভাবেই ‘কৃত্রিম প্রাণ’ নয়। একটা প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন এক ব্যক্তির অনেক দেহাংশ নানা স্থান/সূত্র থেকে প্রতিস্থাপিত, ফলে উনার হয়ত কৃত্রিম পা আছে, আছে যান্ত্রিক হৃদযন্ত্র, তদুপরি হয়তবা উনার যকৃত, চোখের কর্নিয়া ও শরীরের চামড়ার অধিকাংশ প্রতিস্থাপিত (পাঠকগণ নিশ্চয় অবগত আছেন যে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসকল প্রতিস্থাপন সম্ভব)। আপনি কি তাকে ‘কৃত্রিম প্রাণ/মানুষ’ বলবেন? অবশ্যই না। কারণ, মানুষটির প্রাণ প্রতিস্থাপিত হয়নি, ফলে তিনি আগের মানুষটাই আছেন। অবশ্যই এক্ষেত্রে যেমন নতুন প্রাণ সৃষ্টি করা হয়নি, তেমনি ভেন্টরের গনেষনাগারেও নতুন প্রাণ সৃষ্টি করা হয়নি। যা হয়েছে তা হলো, নানা জীবিত সূত্র থেকে উপাদান নিয়ে আরেকটা জীবিত ব্যাক্টেরিয়াতে প্রতিস্থাপন। যদি এমন হত যে সংশ্লেষিত ডিএনএ অজৈব উপাদান থেকে তৈরী করা অজৈব পদার্থে প্রবেশ করানোতে নবপ্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে, তাহলে আমি ‘কৃত্রিম প্রাণ’ সংশ্লেষের উপাখ্যান মেনে নিতাম।

অভিজিৎ রায়ের শেষের সারাংশ পড়ে দেখুন,

আমার মনে পড়ছে মুক্তমনায় আদিল মাহমুদ সোচ্চারে বলেছিলেন, বিজ্ঞানীরা প্রাণ তৈরি করে দেখাতে পারেননিআরেক আনবিক জীববিজ্ঞান পড়া ব্লগার ঋণগ্রস্ত   মুক্তমনায় এসে সদম্ভে জানিয়েছিলেন, আগে বিজ্ঞানীরা প্রাণ তৈরি করে দেখাক, তারপর তিনি নাকি বিবর্তনে বিশ্বাস করেবেন। এ ধরণের মন্তব্য এবং আপ্তবাক্যের সাথে কমবেশি সকলেই পরিচিত। নিঃসন্দেহে ক্রেগ ভেন্টরের সাম্প্রতিক আবিস্কার এই সমস্ত যুক্তির কবর রচনা করলো। তবে তারপরেও ধর্মবাদীরা থেমে থাকবেন না, জানি। নানা ধরনের প্যাচ-ঘোচ খুঁজে বের করবেন। হয়তো বলবেন, এটা আসল প্রাণ নয়, কারণ মাল মশলা প্রকৃতি থেকেই যোগাড় করা; ঈশ্বরের প্রাণ আরো নিঁখুত। কেউ বা বলবেন – এতে প্রমাণিত হল আসলেই ডিজাইনার লাগে। আবার কেউ কেউ হয়তো এখন প্রাসঙ্গিক নানা আয়াত কিংবা শ্লোক ধর্মগ্রন্থে পেয়ে যাবেন। পোপ, পাদ্রী এবং পুরুত ঠাকুরেরা এই ধরনের গবেষণার নৈতিকতা আর মূল্যবোধ নিয়ে নরকগুলজার শুরু করেবেন অবধারিতভাবেই।

উনি তথাকথিত ‘কৃত্রিম প্রাণের’ ফাঁকফোকড় আগেই বুঝেছেন, তাই ‘আমি কলা খাইনা’ কিংবা ‘তাল গাছ আমার’ জাতীয় বুলি আগেভাগেই ব্যবহার করছেন। হ্যাঁ অভিজিৎ রায়, আসলেই এটা আসল প্রাণ নয়; কেননা এর মাল-মশলা জীবিত প্রাণ থেকেই যোগাড় করা হয়েছে, আর প্রতিস্থাপিত হয়েছে আরেকটা জীবিত প্রাণে। অবশ্যই মহান আল্লাহ-তায়ালার সৃষ্ট প্রাণ নিখুঁত, এবং প্রাণের জ্ঞান একমাত্র তাঁর কাছেই আছে।

সুরা বনি-ইস্রাইল (৮৫):

আর তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে প্রাণ (রূহ) সম্পর্কে; বলো – প্রাণ (রূহ) আমার প্রভুর নির্দেশাধীন, আর তোমাদের তো জ্ঞানভান্ডারের যৎসামান্য বৈ দেয়া হয়নি

১ মন্তব্য

  1. ইমরান হাসান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।