«

»

ফেব্রু. ১৮

পদ্মা সেতু ও একজন জামিলুর রেজা চৌধুরী

জামিলুর রেজা চৌধুরী – সংক্ষেপে জেআরসি নামে সুপরিচিত এবং সন্মানিত একজন শিক্ষকের ছাত্র হিসাবে নিজেকে ধন্য মনে করি সব সময়ই। একজন প্রবাদ পুরুষ হিসাবে বাংলাদেশে পুরকৌশল নির্মানের সাথে জড়িত একজন বিশেষজ্ঞ। শিক্ষক হিসাবে অসাধারন – সবচেয়ে চমৎকার উনার বাচনভংগী আর ছাত্রদের প্রতি মমতা বোধ। এক সময় উনার বিষয়ে বিস্তারিত লিখার আশা রাখছি। অবশ্য এই বছরের একুশে পদকের জন্যে নির্বাচিত হওয়ায় অনেকের মতো আমিও খুশী হয়েছি। এই ধরনের মানুষ হচ্ছে একটা দেশের জন্যে সম্পদ – তাদের মূল্যায়ন করতে কোন কাপর্ন্য করা ঠিক নয়। আলোচ্য লেখা অবশ্য জামিলুর রেজা চৌধুরীর জীবন নিয়ে নয় – বরঞ্চ জাতি হিসাবে বাংলাদেশীদের একটা দুর্ভাগ্যের এপিসোড নিয়ে – যারা নিজেদের মেধাকে অবজ্ঞা করে উপনিবেশিক এবং দাসত্বের মানসিকতায় পরিচালিত হয়ে নিজের দেশের বিশিষ্টজনদের উপেক্ষা করে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নানান চড়াই – উৎরাইএ জামিলুর রেজা চৌধুরীর ভুমিকাকে যেভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে তা খুবই বেদনাদায়ক এবং জাতি হিসাবে এক ধরনের দেউলিয়াত্বের পরিচায়ক বটে। 

আসল কথা আসি। পদ্মা সেতু নির্মানের সূচনা হয়েছিলো বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়েই – সেই সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী প্রাথমিক মূল্যায়নের  (Preliminary inspection report) পদ্মার পাড়ে একটা ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। মুল প্রস্তাবনা তৈরী হয় ড. ফকরুদ্দীনের সময়ে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের বাইরে গিয়ে এতো বড় প্রজেক্ট করার মতো চিন্তা কারো মাথায় ছিলো না – না থাকারই কথা কারন বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল বিশ্বের আমলা-টেকোক্রেটদের এক ধরনের পোষাপ্রানীতে পরিনত করেছে – এরা নানান প্রজেক্টে এমন সব প্রভিশন রাখে যা দিয়ে আমলা-টেকনোক্রেটরা বিদেশ ভ্রমন – অবসরের পর কনসালটেন্সী – নানান ধরনের দূর্নীতির সুযোগ ইত্যাদি দিয়ে তাদের মেধা আর সাহসকে একটা দাস মনোবৃত্তিতে পরিনত করে। এইটা যারা উন্নয়ন কর্মসূচীর সাথে জড়িত তারা ভাল করেই জানেন। বিশ্বব্যাংকের এই পে রোলে শুধু সরকারী লোকজন নয় – সংবাদমাধ্যম এবং এনজিওগুলোও থাকে যাতে সামাজিক ভাবে বিশ্বব্যাংক সব সময় সমর্থন পায়। 

বলাই বাহুল্য – ড. ফকরুদ্দীন বিশ্বব্যাংকের একজন আস্থাভাজন লোক ছিলেন – বলা দরকার – বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটা তৈরী করা হয়েছিলো যাতে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো তাদের কর্মসূচীকে দ্রুত বাস্তবায়ন করে নিতে পারে। কারন রাজনৈতিক সরকারের একধরনের সীমাবদ্ধতা থাকে – এরা নিজেদের সমর্থক এবং দেশের মানুষের কাছে যে কোন কাজের ব্যাখ্যা হাজির করতে হয়। তাই দেখা গেছে বিশ্বের যে কোন দেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার জন্যে গনতন্ত্রকে একটা "বিরতি" দেওয়া হয়। সেই বিরতিনর সুযোগ পদ্মা সেতুর অর্থায়নের সকল শর্ত তৈরী করা হলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো নতুন নির্বাচিত সরকার আসায়। এখানে আসে জামিলুর রেজা চৌধুরীর ভূমিকার বিষয়টি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ড. চৌধুরীর সাথে নিয়মিত আলোচনা করেছেন বলে উনার লেখা জানা যায়। বলাই বাহুল্য – বর্তমানে পদ্মা সেতুর যে কাজ হচ্ছে এবং নিজস্ব অর্থায়নের বিষয়টি যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তের কথাই বলা হয় – কিন্তু যতটুকু জানি প্রধানমন্ত্রী ড. জামিলুর রেজার সাথে কারিগরী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। বিশেষ করে পদ্মা সেতুর মতো একটা জটিল নির্মানকাজের বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা কি হবে তা নিশ্চিত করেছেন উনি। 

একটা জাতি হিসাবে পদ্মা সেতু নির্মান একটা বিরাট পদক্ষেপ – যা পরনির্ভশীল আমলা-প্রকৌশলীদের জন্যে একটা বড় শিক্ষা হবে। আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের একটা বড় পদক্ষেপ হিসাবে শিক্ষা দেবে। 

(২)

মজার বিষয় হলো দেশের বাইরের পত্র-পত্রিকাগুলোতে পদ্মা সেতু নির্মান মানেই 'দূর্নীতি" বিষয়টি সবচেয়ে বেশী আলোচিত হয়েছে। অবশেষে কানাডিয়ান কোর্টের রায় হয়েছে সেখানে পদ্ম সেতুর দূর্নীতি বিষয়টি নাকচ হয়ে গেছে। বলা হয়েছে- Ontario judge threw out wiretap evidence key to the case, saying the wiretap applications were based on gossip and rumour. 

অভিযুক্ত লাভালিনের তিন কর্মকর্তা নিদোষ প্রমানিত হয়েছে – সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো কোর্ট বলেছে – বিষয়টি পুরোই গুজব এবং অপবাদ। 

আজকে যদি কানাডার কোর্টে এই অভিযোগের রায় না হতো তবে হয়তো বাকী জীবনই অনেকে বিশ্বাস করতো পদ্মাসেতুতে দূর্নীতি হয়েছিলো। কিন্তু যদি আমরা নিজেদের প্রতি আস্থা রাখতাম – নিজেদের বিশিষ্ট মানুষদের বিশ্বাস করতাম – তবে হয় বিশ্বব্যাংকের এই ধরনের অপমানজনক কর্মকান্ড শুরুতেই প্রতিহত করতে পারতাম। কিন্তু ঐ যে বললাম – উপনিবেশিক মানসিকতা আর দালাল শ্রেনীরাই সমাজকে নিয়ন্ত্রন করে বলেই বিশ্বব্যাকের মতো একটা দূর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্টান বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেবতা হয়ে উঠে – তারা নিজেদের মাঝে বেঁচে থাকা বিশেষজ্ঞদের অবজ্ঞা করতে পারে। 

যদি আমরা শুরু থেকে পদ্মসেতুতে জামিলুর রেজা চৌধুরীর ভূমিকা দেখি এবং তা অনুসরন করি – তবে বিশ্বব্যাংকে মাদবরী খবরদারীতে ব্যর্থ হযৈ দূর্নীতির অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশকে হেয় করার বিষয়টি বুঝতে পারবো। 

জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির প্রধান এবং উনার বক্তব্যের অংশবিশেষ দেখুন – 

"মূল সেতুর ঠিকাদারের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ডিজাইন কনসালট্যান্ট ও বাংলাদেশের প্রাক-যোগ্যতা মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে মতভেদ দেখা দেয়। মূলত একটি চীনা কোম্পানিকে কেন প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা হয়নি, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বারবার জানতে চায় এবং তাদের প্রাক-যোগ্য ঘোষণার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ কমিটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তারা যে অভিজ্ঞতা সনদ প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দিয়েছে তা ভুয়া।

তারা বলেছিল যে, চীনের একটি সেতুতে তারা ইস্পাতের পাইল ব্যবহার করেছে। এর সমর্থনে তারা একটি আলোকচিত্রও জমা দেয়। পরে দেখা যায়, আলোকচিত্রের সেতুটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। এ ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ার পরদিন আমরা কিছু জানানোর আগেই তারা চিঠি দিয়ে প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। এরপরই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের কমিটির সুপারিশকৃত প্রাক-যোগ্য ঠিকাদারদের তালিকা লিখিতভাবে অনুমোদন করে।"

শুরু এখানেই – এবং অবশেষ অনেক ঘটনার পর বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোলিক মেয়াদ শেষে বিদায় নেয়ার কয়েক ঘন্টা আগে একক সিদ্ধান্তে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। 

June 30, 2012: The WB in a statement announces scrapping of the loan financing, saying that it had presented “credible proof of corruption in the Padma bridge project to Bangladesh but the latter did not take step in that regard”.

June 30, 2012: The term of WB President Robert Zoellick expires.

কিন্তু আমরা জানি সেই সময় বিশ্ব্যাংকের একের পর এক শর্ত আসছিলো – ওকে ধরো – তাকে বিদায় দেও – তার বিরুদ্ধে মামলা করো ইত্যাদি। সেই অনুসারে বাংলাদেশের বিশ্ব্যাংকের এজেন্ট পত্রপত্রিকা আর এনজিওগুলো সরব হয়ে হৈ চৈ করছিলো। সরকারও একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছিলো – যদিও অনেকগুলো কেন তারাতারি দেওয়া হচ্ছিলো না তা নিয়ে নানান হৈ চৈ করছিলো পত্র-পত্রিকা আর টকশোওয়ালারা। সেই সময় একজন সচিবকে জেলে পাঠানো হয়েছিলো – একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার অন্য মন্ত্রনালয়ে  দেওয়ার পরও বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট না হওয়ায় পদত্যাগ করতে হয়েছিলো – প্রকৃতপক্ষে সরকার বিশ্বব্যাংকের শর্তগুলো অধিকাংশই মেনে নিচ্ছিলো – কিন্তু রবাট জোলিক হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত যে একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়েছিলেন তা অনেকেই ধারনা করেছে। বলা দরকার উনি আমেরিকার ডেকোক্রেটিক দলের একজন বিশিষ্ট লোক এবং তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্টদের একজন ছিলেন। 

সবচেয়ে লজ্জার কথা হলো – রাজনৈতিক বিভেদ এমন একটা নোংরা অবস্থা চলে গিয়েছিলো – তৎকালীন বিরোধীদলগুলো দেশের স্বার্থের কথা বাদ দিয়ে দলীয় স্বার্থে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের লক্ষ্যে এই দূর্নীতির অভিযোগের সুবাদে নানান অপপ্রচারের মত্ত হয়েছিলো – তারাও জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতামতকে উপেক্ষা করেছে। 

অবশেষ সব খেলা হলো সাংগ – বিশ্বব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট গত বছর বাংলাদেশে একটা লম্ব সফর করে এসেছেন – ধারনা করি ডেমেজকন্ট্রোল অনেকটাই হয়েছে – বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের প্রচুর ফান্ডিং পাচ্ছে – এখন আর দূর্নীতির অভিযোগ নেই – সবাই ভাগবাটোয়ারা ঠিক মতো পেলে কে অভিযোগ করবে! 

আশা করি আমাদের একটা শিক্ষা হবে – দেশী ঠাকুর বাদ দিয়ে বিদেশী কুকুরের প্রণাম করার মতো বোকামী করবো না। বলা দরকার উন্নয়ন প্রকল্প মানেই দূর্নীতি – সেখানে কত চতুরতার সাথে সেই অর্থ ভাগাভাগি করা হয় প্রকল্প তত এফিসিয়েন্ট হয়। তবে পদ্মার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক তাড়াহুড়া করেছে – আর সেখানে শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে অপবাদ দেওয়ার চিন্তাটা ভুল ছিলো। দূর্নীতি নানান ভাবে হয় – সব দূর্নীতি যে উঁচুপদ পর্যন্ত যাবে তা ভেবে নেওয়া ভুল। অবশ্য পদ্মা সেতুর প্রাথমিক কাজগুলো – যেমন ভূমি অধিগ্রহন আর পূর্নবাসন ছিলো দূর্নীতিমুক্ত এইটা বলতে কোন দ্বিধা নেই – অর্থাৎ যে সময়ে দূর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছিলো তখন সেইটা ছিলো ধারনাগত। আর সেই ধারনা বা আন্দাজ অনুমানের পিছনে দৌড়াতে গিয়ে অনেকেই তাদের বিশ্বাযোগ্যতা হারিয়ে আজ দেউলিয়ায় পরিনত হয়েছে। আর বিরোধীদল এককাঁঠি এগিয়ে প্রধানমন্ত্রী আর তার পরিবারকে জড়াতে গিয়ে নিজেদের শীর্ষ পদের লোকজনের দূর্নীতির কথাই আবার স্মরন করিয়ে দিলেন দেশের মানুষকে। 
 

৯ মন্তব্য

এক লাফে মন্তব্যের ঘরে

  1. করতোয়া

    খুব সুন্দর লিখেছেন। থলের বেড়ার বের করার অনন্য প্রচেষ্টা। ধন্যবাদ আপনাকে।

    করতোয়া

  2. সুজন সালেহীন

    আদালতের বিচারক এসএনসি-লাভালিন-এর তিন সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তাদের এই বলে খালাস দেন যে প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে যেসব অয়্যারটেপ [ফোনে আড়ি পাতা] হাজির করেন সেগুলো আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। এর জবাবে প্রসিকিউটর বিচারককে জানান যে রাষ্ট্র এই বিচার চালাতে আর আগ্রহী নয়। কারণ, অয়্যারটেপ গ্রহণ করা না হলে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করার অন্য কোন সুযোগ তাদের নেই। এর মানে এই নয় যে, অভিযুক্তরা নির্দোষ। অথবা, এই তিনজনের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণই নেই সে কথাও বলা হয়নি। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগগুলো যে ‘বানোয়াট কাহিনী’, ‘গুজব’ ও ‘রটনা’র ওপর ভিত্তি করে আনা হয়েছে – এমন কোন রায় আদালত দেয়নি। উল্লেখ্য উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে খুনের মামলার আসামীকেও বেকসুর খালাস দিতে আদালত বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সি (আইভিপি)’র নিজস্ব তদন্তের জের ধরে কানাডার কোর্টে এই মামলাটি দায়ের করা হয়। আইভিপি’র তদন্তে দেখা যায়, “পদ্মা মাল্টি-পারপাস ব্রিজ প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা, এসএনসি-লাভালিনের নির্বাহী ও বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চমাপের দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে।” কথিত ষড়যন্ত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক যেসব শর্ত দিয়েছিলো বাংলাদেশ সরকার সেগুলো মানতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে অভিযোগের প্রমাণ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে বিশ্বব্যাংক ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ স্থগিত করেনি। পেশ করা প্রমাণ মতো সরকার “উচ্চমাপের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা’ নিলে বিশ্বব্যাংক “কোন বিকল্প উপায়ে, টার্নকি-স্টাইলের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে প্রকল্পে” তহবিল অব্যাহত রাখার উপায় খুঁজে বের করতে চেয়েছিলো। বিশ্বব্যাংকের কথা মতো বাংলাদেশ সরকার চারটি ব্যবস্থার দুটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরেই কেবল চুক্তিটি স্থগিত করা হয়। শর্ত দুটি ছিলো: তদন্ত চলাকালে নির্দিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদেরকে সরকারি কাজের বাইরে রাখতে হবে এবং তথ্য আদান প্রদানের জন্য বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের দূর্নীতি দমন কমিশন(এসিসি)’র মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মেনে নিতে হবে। এসিসির দুর্নীতির প্রক্রিয়া পর্যালোচনার জন্য বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের ‘এক্সটার্নাল প্যানেল’ গঠন করে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ওই প্যানেলের লেখা এক চিঠিতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত অভিযোগের কিছু প্রামাণিক ভিত্তি তুলে ধরা হয়। এসিসি’কে পাঠানো ওই চিঠিতে এসএনসি লাভালিন, বাংলাদেশের আমলা ও মন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠক ও আলাপ-আলোচনার দিনক্ষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। এতে ২০১১ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন এসএনসি’র দু’জন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের কয়েক সপ্তাহ পর বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) এসএনসি লাভালিনকে ঠিকাদারি কাজটি দেয়ার সুপারিশ করে বিশ্বব্যাংকের কাছে একটি মূল্যায়ন রিপোর্ট পাঠায়। এছাড়া ২০১২ সালের জুনে দেয়া এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক জানায় যে “তাদের করা দুটি তদন্তে পাওয়া প্রমাণাদি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০১২ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ এসিসি’র চেয়াম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে যাতে বিষয়টির পূর্ণ তদন্ত সাপেক্ষে দায়ি ব্যক্তিদের ন্যায্য শাস্তি নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। পদ্মাসেতু নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ নিজস্ব উপায়ে তদন্তের পর ২০১৩ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক এসএনসি লাভালিন ও তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বব্যাংকের ঠিকাদারি কাজে অংশ নেয়া দশ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। বিশ্বব্যাংক ও কর্পোরেট গ্রুপটির মধ্যে আলোচনার পর যে নিষ্পত্তি চুক্তি হয় তার ভিত্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য তার কর্মপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা যদি পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্পের দূনীতিতে জড়িত না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কেন বিশ্বব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা মেনে নিল ও দূর্নীতিরোধে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশানুযায়ী তাদের কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনল? কানাডার আদালত কোম্পানি’র কর্মকর্তাদের খালাস দিয়েছে কিন্তু বিশ্বব্যাংক দশ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কোন আপত্তি ছাড়াই কোম্পানি বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে।

  3. আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    @করতোয়া,

    ধন্যবাদ।

    সেই সময়টা খুবই খারাপ সময় ছিলো। সরকার একদিকে ব্যস্ত ছিলো জামায়াতের সন্তাসী তান্ডবে – অন্যদিকে বিএনপির সরকার পতনের আন্দোলন। এর মাঝ এই্ অভিযোগের বিষয়ে সুশীল আর মিডিয়ার বাণিজ্যে – সব মিলে সত্য আর মিথ্যা একাকার হয়ে গিয়েছিলো। সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছি বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষগুলোও এক ধরনের ঘোরের মাঝে ছিলো। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতো একজন মানুষের মতামত শুনার চেয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আবদার শুনার দিকে বেশী মনোযোগী ছিলো। বস্তুত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অন্যায় আব্দারের কাছে নিজের দেশের মানুষের সন্মান আর মর্যাদা তুচ্ছ বিবেচনা করেছে।

    মজার বিষয় হলো আজ বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের দূর্নীতি ধরে বেড়াচ্ছে। খবর দেখছি –

    “শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা ১৬টি গাড়ি নিয়ম বহির্ভূতভাবে হস্তান্তরের অভিযোগে তদন্ত শুরুর পর দুটি গাড়ি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের হাতে তুলে দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।”

  4. আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    @সুজন সালেহীন

    আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এডিআর বলে একটা পদ্ধতি আছে – ব্যবসার স্বার্থে কোম্পানীগুলো কোর্টের বাইরে নেগোশিয়েশন করে যাতে কোর্টের গিয়ে সময় এবং অর্থের স্বাশ্রয় করা যায়। বাংলাদেশের লাভানিলের কোন ব্যবসা নেই – অদূর ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা নেই – ফলে তারা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাথে নেগোশিয়েশন করে ১০ বছর – শর্তস্বাপেক্ষে আট বছর বাংলাদেশে কোন ব্যবসা করবে না। ইতোমধ্যে চার তিন বছর শেষ – আর পাঁচ বছর পরে এর আবার যেতে পারবে। বিনিময়ে সারা বিশ্বে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে কাজ করতে বাঁধা থাকবে না। এর মানে ওরা দূর্নীতির অভিযোগ মেনে নিয়েছে – এই ধরনের চিন্তা করা ভুল অথবা অজ্ঞতা। যদি তাই হতো – তবে ওরা কানাডার কোর্টের ডিফেন্ড করতো না।

    যাই হোক – আমার লেখার বিষয়ে দুইজন নিয়মিত মন্তব্যকারী দেখা যায় – যারা শুধু এই কাজটাই করার জন্যে সদালাপে আসে। এই দুইজনের মাঝে একটা মিল হলো এরা কোন বিচারই মানে না – হউক বাংলাদেশের ট্রাইবুন্যাল বা কানাডার সুপিরিয়র কোর্ট। এরা মুলত বিচার মানি না তাল গাছ দেও গ্রুপের মানুষ। এই গ্রুপে শুধু আপনি না – কামাল হোসেনের ঘর জামাই ডেভিড বার্গম্যানও আছে। আপনি বোধ হয় ডেভিড বার্গম্যানের কপি পেস্ট করছেন – না করলে করতে পারে। উনি এই ধরনের কুযুক্তি দেখিয়ে কোর্টে সাজা পেয়েছে – এখন বোধ হয় কানাডার কোর্টেও একটা ঝাড়ি খাবেন।

    যাই হোক – আপনার জ্ঞাতার্থে বিএনপি শীর্ষ নেতা ব্যারিষ্টার মুওদুদের দুইটা বক্তব্য দিলাম – দেখুন ভেবে দেখার মতো কিছু পান কিনা।

    ১) বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, যত কিছুই করুক, এ সরকারের আমলে আর পদ্মা সেতু হবে না। কারণ তারা পদ্মা সেতু চায় না। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই বিশাল প্রকল্প থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়া। তিনি বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতেই সরকার বিশ্বব্যাংককে পত্র দিয়ে জানিয়েছে, সহায়তার প্রয়োজন নেই। এই সরকার লোক দেখানোর জন্য কোটি টাকা খরচ করে পদ্মা সেতুর একটি নামফলক উদ্বোধন করবে।
    (দৈনিক দৈনিক ইত্তেফাক, সোমবার ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

    ২) পদ্মা সেতু দুর্নীতি সম্পর্কে বলেন তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে সে সময় আমরা যে বক্তব্য দিয়েছি তা রাজনৈতিক বক্তব্য। কানাডার আদালতে প্রমাণ হয়েছে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয় নি।
    (দৈনিক দৈনিক ইত্তেফাক, মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)

    (একই পত্রিকা – একই নেতা শুধু সময়টায় চার বছরের পার্থক্য)

    ধন্যবাদ।

  5. jahid

    ভালো তথ্য শেয়ার করলেন। ধন্যবাদ

  6. সুজন সালেহীন

    @আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    Alternative Dispute Resolution সংক্ষেপে ADR বর্তমানে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নয় বিচার ব্যবস্হায়ও বিবাদমান পক্ষগণের বিরোধ মেটানোর বহুল প্রচলিত পদ্ধতি। এটাকে আমাদের সহজ বোধগম্যের জন্য সালিশ বলতে পারি। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও আদালতের উপর চাপ কমানোর জন্য আদালতের বাইরে বিবাদমান পক্ষগণের বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য বর্তমানে ADR অবলম্বনের উতসাহ দেয়া হয়। কোন কোন দেশে মামলা শুরুর আগে আদালত ADR অবলম্বনকে বাধ্যতামূলক করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যদি এসএনসি-লাভালিন ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে কোন বিরোধ সৃষ্টি নাহলে ADR এর কথা আসবে কেন? আর এই ADR এর বিষয়বস্তু ও ফলাফল কি ছিল?

    পদ্মাসেতু প্রকল্পে দূর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিশ্বব্যাংক কানাডিয়ান ইন্জিনিয়ারিং প্রতিষ্টান এসএনসি-লাভালিনকে যে দশবছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তা বিশ্বব্যাংকের সেটেলমেন্ট ইতিহাসে এযাবতকালের সবচেয়ে বড় শাস্তি। এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসএনসি-লাভালিন শুধু বিশ্বব্যাংক নয়, অন্যান্য বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের সাথেও কাজ করতে পারবেনা। বিশ্বব্যাংক কারো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয় কিংবা কোন রাজনৈতিক সরকারের হাতের লাঠিও নয়। এডিবি, আইডিবি, জাইকার মত প্রতিষ্টানও এ অভিযোগের পক্ষে সরে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা বাংলাদেশীরা অতিমাত্রায় রাজনীতিপরায়ণ যার জন্য আমাদের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিণাম কি হবে তা ঐ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক রঙ দেখে আগাম বলে দেয়া যায়! আমাদের দূর্নীতি দমন কমিশন আমাদের দেশীয় সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধেতো তদন্ত করার কিছুই পায় নাই! অবশ্য আমাদের একচক্ষু বিশিষ্ট দূর্নীতি দমন কমিশন টাকার চালাসহ ধরা খাওয়া সদ্য প্রয়াত গুপ্তবাবুর বিরুদ্ধেও কিছু পায় নাই!

  7. Mona

    সুন্দর পোস্ট ।

  8. আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    @ সুজন সালেহীন " আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা বাংলাদেশীরা অতিমাত্রায় রাজনীতিপরায়ণ যার জন্য আমাদের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়ে যাচ্ছে। " – ধন্যবাদ নিজেকে চেনার জন্যে – বিশ্বব্যাংকের পক্ষে এতো বড় সাফাই আমি জীবনে আর কোথায় শুনিনি – এই যাবত জানতাম বিশ্বব্যাংক পুঁজিবাদ প্রসারের জন্যে এবং সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বকে দাড় করানো লক্ষ্যেই কাজ করছে। যাই হোক – বিশ্বব্যাংক আপনার কাছে নমস্য কারন ওরা এই সরকারের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ তুলেছে – আর সেই সুযোগে গুপ্তবাবুও এসে গেলেন আপনার কমেন্টে। রাজনীতি কাকে বলে!

     

     

  9. আরিফ

    @জিয়াউদ্দিন,

    বুঝা যাচ্ছে-যেহেতু ফোনে আড়ি পাতা প্রমাণ গ্রহণীয় নয়-সেহেতু দুর্নীতির অভিযোগ আমলে না নিয়েই বিচারক এসএনসি-লাভালিন-এর তিন সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তাদের খালাস দিয়েছিল। তার মানে কানাডার আদালত দুর্নীতি অভিযোগ খতিয়ে দেখেনি।

    যেহেতু অভিযোগ খতিয়ে দেখেনি- সেহেতু দুর্নীতি হতেও পারে- আবার নাও হতে পারে।

    কিন্তু আপনি জিয়াউদ্দিন কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে দুর্নীতি হয়নি?

Comments have been disabled.